[ ] 2012-01-02 |
|
|
 |
|
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি : কার দায় কার ঘাড়ে? |
 |
চার মাসের মধ্যে তিন দফায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এর আগে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে কখনোই এভাবে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সরকারের ওপর থেকে ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমলেও নতুন ঝুঁকির মুখে পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। ব্যাংক ঋণ সংকোচন, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাসহ নানা কারণে সামপ্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতিতে বিরাজ করছে টালমাটাল অবস্থা। দ্রব্যমূল্যের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতিসহ নানামুখী সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। ব্যাহত হচ্ছে কৃষি ও শিল্পের উত্পাদন। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধি এসব সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করবে বলে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন।
অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন অস্থিরতা তৈরি হবে। বিশেষ করে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতিতে চরম সংকট তৈরি করবে। কারণ এ দু’ধরনের জ্বালানি দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। মূল্যবৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে কৃষক। কারণ এ মুহূর্তে সারাদেশে ইরি-বোরো চাষের মৌসুম শুরু হচ্ছে। আগামী দেড় মাস ধানের জমিতে নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে। ফলে ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি ধান উত্পাদনে কৃষককে বাড়তি খরচের বোঝা বইতে হবে।
গত বোরো মৌসুমের পর থেকে সরকার প্রতি লিটার ডিজেলের দাম তিন দফায় ১৫ টাকা বৃদ্ধি করেছে। বোরো মৌসুমে সেচে এক কোটি ১০ লাখ লিটার ডিজেল ব্যবহার হয়। সে হিসেবে ডিজেলে কৃষকের সেচ বাবদ খরচ বাড়বে দেড় হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি বিইআরসি সেচের বিদ্যুতের দামও বাড়িয়েছে পাঁচ ভাগ। কীভাবে এ দাম বৃদ্ধি কৃষিতে সমন্বয় করা হবে তা এখনও সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট করা হয়নি।
শুধু কৃষি নয়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। তাদের মতে, নতুন করে তেলের দাম বাড়ানো হলে কৃষির পাশাপাশি শিল্পখাতেও উত্পাদন ব্যয় বাড়বে। এরসঙ্গে যুক্ত হবে বর্ধিত পরিবহন ব্যয়। এসব কারণে উত্পাদিত পণ্যের মূল্য বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশে উত্পাদিত পণ্য। ফলে রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে সরকারি তথ্য বিবরণীতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যে জ্বালানি তেল ক্রয় করে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে দেশের অভ্যন্তরে বিক্রি করায় দীর্ঘদিন ধরে লোকসান দিয়ে আসছে। গত (২০১০-১১) অর্থবছরে বিপিসির লোকসানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে দেশে জ্বালানির চাহিদা ছিল প্রায় ৪৮ লাখ টন। বিদ্যমান বিদ্যুত্ সংকট মোকাবেলায় জরুরিভিত্তিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন ও অন্যান্য খাতে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি অর্থবছরে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে ৬৮ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বিক্রয় মূল্য অব্যাহত রাখলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অপরিবর্তিত থাকলে চলতি অর্থবছরে বিপিসির লোকসানের পরিমাণ ১৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াবে। ফলে এ খাতে সরকারকে প্রচুর ভর্তুকি দিতে হবে যা সরকারের আয় থেকে সংকুলান করা অসম্ভব। এ পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হলে অন্যান্য অত্যাবশ্যক ব্যয়সহ উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হবে। আবার ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।
তথ্য বিবরণীতে আরও বলা হয়, বর্তমানে বিপিসি দেশি-বিদেশি ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান ১০ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় বিপিসির আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বিপিসির আর্থিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। সংস্থাটির পক্ষে ঋণ পরিশোধ ও জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ ও আমদানি অব্যাহত রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে জ্বালানি তেলের বিক্রয় মূল্য বৃদ্ধি করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
সরকার কখনোই এ কথা বলছে না, তেল আমদানির ওপর বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স ধার্য্য করে রাখা হয়েছে। এ খাতে যে পরিমাণ ট্যাক্স আদায় করা হচ্ছে, জনগণকে দেওয়া ভর্তুকির পরিমাণ এর চেয়ে অনেক কম। এই ট্যাক্স তুলে দিলেই জ্বালানি আমদানিতে সরকারকে আর ভর্তুকি দিতে হবে না। শুধু মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) তুলে নিলে জ্বালানি খাতে সরকারের তরফ থেকে যে ভর্তুকির কথা বলা হচ্ছে তা আর থাকত না। গত ১০ নভেম্বর প্রকাশিত গেজেটে দেখা যায় ডিজেল, কেরোসিনে এবং ফার্নেস অয়েলে যথাক্রমে ৬.৮৯ টাকা, ৬.৯৯ টাকা এবং ৬.৯৮ টাকা ভ্যাট দিতে হয়। এছাড়া ব্যবসায়ী পর্যায়ে ডিজেল এবং অকটেনে ৮৪ পয়সা এবং ফার্নেস অয়েলে ৮২ পয়সা ভ্যাট মূসক দিতে হয়। একইভাবে অকটেন এবং পেট্রোলে যথাক্রমে ১০.৯৪ এবং ১০.৫৭ টাকা ভ্যাট দেওয়া হয়। ব্যবসায়ী পর্যায়ে যা এক দশমিক ৩৩ এবং এক দশমিক ২৯ টাকা।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, জ্বালানি তেলের মূল্য না বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় সমস্যা সমাধান করতে হবে। দেশে বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে সব সেচযন্¿ে বিদ্যুত্ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া জ্বালানি সংরক্ষণ, দুর্নীতি ও অপচয় রোধের মাধ্যমে কিছুটা হলেও সংকট নিরসন করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দিতে আপত্কালীন সময়ের জন্য আমদানি শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে বিপিসির ব্যয় সংকোচন সম্ভব।
অবশ্য বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল এবং তা ব্যারেলপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ মার্কিন ডলারে ওঠানামা করছে। এ অবস্থায় অনেক দেশই তেলের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। শুধু এ বছরই ভারত সরকার জ্বালানি তেলসহ পেট্রোলিয়ামজাত সব ধরনের পণ্যের দাম কমিয়েছে দু’বার। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমে যাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। বাংলাদেশে ঘটছে উল্টো ঘটনা। ভারতে জনগণের মাথাপিছু আয় ও ক্রয়ক্ষমতা এ দেশের মানুষের চেয়ে বেশি। ফলে এ দেশে তেলের দাম ভারতের চেয়ে অনেক কম হওয়াই স্বাভাবিক।
তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার আরেকটি যুক্তি দেয়, সীমান্তবর্তী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য যথেষ্ট কম থাকায় চোরাচালানের মাধ্যমে জ্বালানি তেল পাচার হওয়ার আশঙ্কা ও ঝুঁকি থেকেই যায়। জ্বালানি তেল পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। এজন্য সীমান্তে বিজিবির পাহারা ও নজরদারি বাড়াতে হবে। জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে বরং দেশবাসীর কাছে তা আরও সহনীয় কী করে করা যায় সে কথাই ভাবা উচিত।
মূলত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চাপের কারণেই সরকার ধারাবাহিকভাবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করছে। আইএমএফের কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেতে সরকার তাদের শর্ত পূরণের জন্য জ্বালানি তেলের ওপর দেওয়া ভর্তুকি কমিয়ে দিচ্ছে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ সংস্থাটি যে ৭টি শর্ত দিয়েছে তার অন্যতম হলো ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়া। একইভাবে বিশ্বব্যাংকও ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত বেঁধে দিয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে— জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে বিপিসির লোকসান কমিয়ে আনা, কর প্রশাসনের সংস্কার এবং আমদানি পণ্যের শুল্ক হ্রাস।
আবার সরকার বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি করে। এ ধরনের তেলের দাম অনেক বেশি। পরিশোধিত তেলের বদলে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে শোধন করার পর বিক্রি করা হলে দাম অনেকটাই কমে আসবে। দেশে নতুন তেল শোধনাগার স্থাপন করা হলে এটা সম্ভবপর হতে পারে। জ্বালানির দামের সঙ্গে যেহেতু মানুষের জীবনযাত্রার ভালো-মন্দের প্রশ্ন জড়িত, সেহেতু এ ব্যাপারে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন। জনগণের সার্বিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং দেশের উন্নয়নে একটি কার্যকর ও বাস্তবানুগ জ্বালানিনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দু’ দফায় জ্বালানি তেলের দাম ৩৬ শতাংশ বাড়ানো হয়। মূলত এ দরবৃদ্ধির পেছনে ছিল বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের চাপ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। বিশ্ববাজারে দাম কমলে ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর দেশেও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমানো হয়। সর্বশেষ বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের এক সপ্তাহের মাথায় ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রতি লিটার ডিজেলের দাম দুই টাকা করে কমানো হয়েছিল। তবে চলতি বছর থেকে সরকার আবারও অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধারায় ফিরে যায়। এ বছরের ২৪ জানুয়ারি প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম এক লাফে ৯ টাকা বাড়ানো হয়। ৬ এপ্রিল আবারও প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ৫ টাকা বাড়ানো হয়। এরপর ৫ মে সব ধরনের জ্বালানির দাম লিটার প্রতি বাড়ে ২ টাকা। গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রতি লিটার পেট্রোল, ডিজেল ও অকেটেনের দাম ৫ টাকা ও ফার্নেস অয়েলের দাম প্রতি লিটারে ৮ টাকা বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত ১০ নভেম্বর এবং ২৯ ডিসেম্বর কেরোসিন, ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও ফার্নেস অয়েলের দাম দু’ দফায় ৫ টাকা করে মোট ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। |
| |
|
| |
|
|
|
|
|
|
Today's Other News
|
| Related Stories |
|
|
 |
|
|