বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ আর নয়। এ চাপ কমাতে বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। ভর্তুকি ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় মেটাতে গঠন করা হচ্ছে বিশেষ তহবিল। এ তহবিলে অর্থ সংগ্রহে প্রতিটি ফোনকলের মিনিটপ্রতি সারচার্জ আরোপ করা হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ পয়সা। একই সঙ্গে বাড়ানো হচ্ছে আবাসিক ও শিল্প এলাকায় গ্যাসের দাম। এখানেই শেষ নয়, আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ তহবিলের জন্য রাখা হবে বিশেষ বরাদ্দ। এ দিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ মেটানো হবে। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদন পাওয়ার পরই তহবিল গঠনের কাজ শুরু হবে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ সচিব আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতেই তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি গঠন করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিভিন্ন ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে। এ খাতে অর্থের সমস্যাও অনেকটা কেটে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি : চলতি ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেট ঘোষণার সময় বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা এবং জ্বালানি খাতে ৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এ ভর্তুকির ৬০ শতাংশই দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। এ খাতে ভর্তুকি দেওয়ার মূল কারণ হচ্ছে জ্বালানি তেলের মূল্য স্থানীয় বাজার থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিস্তর ফারাক। কেন এ তহবিল : বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৮ হাজার ১৩৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ২ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট তরল জ্বালানিভিত্তিক। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত নতুন ৪৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। এগুলোর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ১ হাজার ৪১৫ মেগাওয়াট এবং তেলভিত্তিক ১ হাজার ৯১৫ মেগাওয়াট। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় প্রতি লিটার ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের স্থানীয় বাজারমূল্য ছিল ৪৪ এবং ২৬ টাকা। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য যথাক্রমে ৮৩ ও ৬৯ টাকা। স্থানীয় বাজারে এখন ডিজেল ৬১ ও ফার্নেস অয়েল ৬০ টাকা। স্থানীয় বাজারমূল্য অনুযায়ী বর্তমানে চালু তেলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অর্থাৎ ২ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট প্লান্ট চালু রাখলে মাসিক প্রায় ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন অনুমোদিত প্রতি ইউনিটে ৪.০২ টাকা হিসেবে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রয় করে বিউবো মাসিক ৫১০ কোটি টাকা রাজস্ব পাবে। এতে সরকারকে এ ঘাটতি পূরণে মাসিক প্রায় ১ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা এবং বছরে ১৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এ ছাড়া আগামী ২ বছরে নির্মাণাধীন তরল জ্বালানিভিত্তিক আরও ২ হাজার ৩৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এগুলো প্রায় সবই ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। এর মধ্যে কিছু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবসরে যাবে। তা বাদ দিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মোট ৩ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট ফুল ক্যাপাসিটিতে (৮০ শতাংশ) চালালে তেল কিনতে বিউবোর মাসিক প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা লাগবে। এতে বর্তমানের চাহিদার তুলনায় সরকারকে দ্বিগুণ ভর্তুকি দিতে হবে। স্থানীয়ভাবে তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের কারণে তেলের দাম আরও বাড়লে বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি বৃদ্ধি পাবে। এ ঘাটতি লাঘবের লক্ষ্যে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের পূর্ববর্তী পরিকল্পনা সংশোধন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আগামী ২০১২-১৩ অর্থবছরের মধ্যে এ ঘাটতি পুরো সমন্বয় সম্ভব নয়। যেভাবে গঠন করা হবে তহবিল : জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিজনিত কারণ দেখিয়ে প্রতিটি ফোনকলে মিনিটপ্রতি ১৫-২০ পয়সা সারচার্জ আরোপ করা হবে। ফলে সরকারি-বেসরকারি ফোন গ্রাহকদের মিনিটপ্রতি ১৫-২০ পয়সা বেশি গুনতে হবে। শিগগিরই এ ব্যাপারে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। তারা প্রতিটি ফোন কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। ফোনকলের বর্ধিত টাকা এ তহবিলে চলে আসবে। এ ছাড়া বাড়ানো হবে আবাসিক ও শিল্প এলাকার গ্যাসের দাম। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা শিগগিরই গ্যাসের দাম বাড়াতে গণশুনানির ব্যবস্থা করবে। প্রতি ঘনফুট গ্যাসের যে দাম বাড়বে এ বর্ধিত অর্থও তহবিলে চলে আসবে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে ২-৩ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করা হবে। এ অর্থও তহবিলে আসবে। আগামী অর্থবছরের বাজেটেও এ তহবিলের জন্য বরাদ্দ রাখা হবে। এখান থেকে অর্থ নিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ মেটানো হবে। এ তহবিলের অর্থ বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দের বাইরে থাকবে। তহবিল পরিচালনায় একটি কমিটি গঠন করা হবে। এ কমিটির চেয়ারম্যান থাকবেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব। এ কমিটিই নির্ধারণ করবে বিদ্যুৎ খাতের কোন কোন পর্যায়ে তহবিলের অর্থ খরচ করা হবে।