[ ] 2012-05-23 |
|
|
 |
|
তৈরী পোশাক শিল্পের শ্রমমান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর চাপ |
 |
মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিজিএমইএ
ইমরান আলম
বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক শিল্পের শ্রমমান নিয়ে প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। শ্রমমান নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা রূপরেখা চুক্তি (টিকফা) সইয়ের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে। অন্য দিকে উন্নততর পরিবেশে উৎপাদিত পণ্যের জন্য ক্রেতাগণ অধিক মূল্য দিতে রাজি বলে জানিয়েছে ইইউ। বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের প্রায় ৯০ শতাংশ রফতানি হয় এ দু’টি অঞ্চলের বাজারে। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট দেশ ও জোটের রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের শ্রমমান নিয়ে তাদের ক্রেতাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তবে শ্রমমান নির্ধারণের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশ তৈরী পোশাক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি শফিউল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, গার্মেন্ট খাত অনেক বড় একটি শিল্প। ’৮০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া এ শিল্প পরিকল্পিতভাবে গড়ে না ওঠায় কিছু বিচ্যুতি থাকতেই পারে। তবে বেশির ভাগ গার্মেন্ট শিল্পেই ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বেটার ওয়ার্ক প্রোগ্রামের আওতায় এসেছে। সব কিছু মিলিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, উন্নত হচ্ছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে তৈরী পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক দেয়। অঙ্কের দিক থেকে এর পরিমাণ প্রায় ৭৫ কোটি ডলার। এ পরিমাণ অর্থ পোশাক শিল্পের শ্রমমান উন্নয়নের জন্য যথাযথভাবে ব্যয় করা হলে পরিস্থিতি এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে। টিকফা চুক্তির ব্যাপারে তিনি বলেন, বিষয়টি বাস্তবতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চুক্তিতে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। এখানকার সরকারি ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিবিএ নেতারা রাতারাতি কোটিপতি বনে যান। ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে শ্রমিক স্বার্থ রক্ষিত হলে সিবিএ নেতাদের এমন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার কথা নয়। সিবিএ নেতাদের অনিয়ম বাংলাদেশে ওপেন সিক্রেট। উন্নত দেশগুলোর সাথে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনেক পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতকে সুরক্ষা দেয়ার মাধ্যমে একটি পর্যায়ে পৌঁছার সুযোগ দিতে হবে। টিকফা সই করলে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দেয়া বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়াবে। এর সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়বে রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল অর্থাৎ ইপিজেডগুলোতে। ট্রেড ইউনিয়ন হলে ইপিজেডগুলোতে কাজের পরিবেশ থাকবে না। বাংলাদেশের শ্রম পরিবেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরী পোশাক ক্রেতারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন মন্তব্য করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা গত সোমবার এক সংলাপে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। কিন্তু বাংলাদেশ ব্র্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ ক্রেতারা তাদের উদ্বেগের কথা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টিকফা সম্পাদনে বিলম্বের কারণে আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তৈরী পোশাক শিল্পের শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপেও গভীর প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ইউনিয়নগুলো বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধা বাতিলের জন্য মার্কিন সরকারের কাছে লিখিতভাবে আহ্বান জানিয়েছে। অন্য দিকে বাংলাদেশের শ্রমমান ও কাজের পরিবেশ উন্নত করতে ইউরোপীয় ক্রেতাদের চাপ রয়েছে উল্লেখ করে ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হান্না গত ১৫ মে এক সেমিনারে বলেছেন, এ ব্যাপারে ইইউর তরুণসমাজ বেশ সচেতন। তারা স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে শ্রম শোষণ সমর্থন করে না। উন্নততর পরিবেশে উৎপাদিত পণ্যের জন্য ইইউর ভোক্তারা বেশি দাম দিতেও রাজি আছে। জিএসপি সুবিধায় গার্মেন্ট পণ্য অন্তর্ভুক্ত নয় উল্লেখ করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ১৯৯৫ সালে গার্মেন্ট খাত থেকে শিশুশ্রম নির্মূল করা হয়। বিশেষ স্কুল এবং আহার ও শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন করা হয়। শিশুশ্রম নির্মূলের পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেয়া শুল্ক থেকে অব্যাহতি পেলে আমরা উৎসাহবোধ করতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাত পায়নি। শ্রমমান উন্নয়নে বিজিএমইএ সার্বিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে উল্লেখ করে শফিউল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে বিজিএমইএ ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা করছে। এতে বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি এইডস ও যক্ষ্মা সম্পর্কে সচেতন করার কর্মসূচি রয়েছে। ঢাকায় ১৫০ শয্যা ও চট্টগ্রামে ১০০ শয্যার দু’টি হাসপাতাল নির্মাণ করছে বিজিএমইএ। সমিতির সদস্যভুক্ত শিল্পগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য যৌথ বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সামনে ভর্তুকি মূল্যে চাল দেয়া হবে। আমিনুল হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে; প্রক্রিয়াটি থেমে নেই। জিএসপির আওতায় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বছরে মাত্র তিন কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয় উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানান, এ কথা ভুললে চলবে না যে, আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি অংশ। আমিনুল ইসলাম কেবল গার্মেন্ট শিল্পের শ্রমিক নেতাই নন, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত শ্রম অধিকারসংক্রান্ত এনজিও বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটিতে (বিসিডব্লিউএস) কর্মরত ছিলেন। গত চার এপ্রিল আশুলিয়া থেকে গুম হওয়ার পর তার মৃতদেহ টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে পাওয়া যায়। মৃতদেহে নির্যাতনের চিহ্নও স্পষ্ট ছিল। যুক্তরাষ্ট্র সরকার চাইছে, বিষয়টি যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইইউ ও কানাডার ট্রেড ইউনিয়নগুলোও একই দাবি জানিয়েছে। তিনি বলেন, এই দাবির যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না। |
| |
|
| |