হজযাত্রী বহন নিয়ে এবারও চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে বিমান
মুজিব মাসুদ:
হজযাত্রী পরিবহনে এয়ারক্রাফট লিজ নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা বিমানের। আর মাত্র চার মাস পর শুরু হচ্ছে হজযাত্রী পরিবহনের কাজ। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন উড়োজাহাজ ভাড়া করতে পারেনি বিমান। তিন মাস আগে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী উড়োজাহাজ পায়নি। যাচাই-বাছায়ের পর দুটি উড়োজাহাজ কোম্পানিকে বাছাই করা হলেও শেষ মুহূর্তে এসে একটি কোম্পানি উড়োজাহাজ দিতে অপারগতা জানিয়েছে। এ অবস্থায় আবারও দুটি উড়োজাহাজের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রতি বছর হজের আগে উড়োজাহাজের তীব্র সংকট দেখা দেয়। কারণ হজযাত্রী পরিবহনের জন্য পৃথিবীর সব বিমান সংস্থাই উড়োজাহাজ ভাড়া নেয়। ইতিমধ্যে ভালো মানের উড়োজাহাজগুলো ভাড়াও হয়ে গেছে। তাই শেষ মুহূর্তে বিমানের পক্ষ থেকে এখন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন দিয়েও ভালো মানের এয়ারক্রাফট পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যার কারণে এবারের হজযাত্রী পরিবহনে বড় ধরনের কেলেংকারির ঘটনা ঘটতে পারে বলে তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিমানের একটি সূত্র জানায়, শুধু হজযাত্রী পরিবহনে নয়, এবার সিডিউল যাত্রী পরিবহনেও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ঘটতে পারে। কারণ বর্তমানে বহরে থাকা ১২টি এয়ারক্রাফটের মধ্যে ৬টিই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। টাকা দিতে না পারায় দুটি ইঞ্জিন একটি বিদেশী মেরামতকারী কোম্পানি আটকে রেখেছে। হজের আগে এগুলো বহরে ফেরারও কোন সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। সংকট নিরসনে হজের জন্য নেয়া তিনটি বোয়িং ৭৪৭ এর মধ্যে একটি জাহাজ এক বছরের জন্য নেয়ার সুপারিশ করলেও কমিশন বাণিজ্যের কারণে তাতে রাজি হচ্ছে না বিমানের একটি সিন্ডিকেট। তারা চাচ্ছে শুধু হজযাত্রী পরিবহনের জন্য মাত্র ৩ মাসের জন্য উড়োজাহাজ ভাড়া করতে। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, তাদের কাছে অভিযোগ আছে বিমানের একটি সিন্ডিকেট এবারের হজ মৌসুমে বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ঘটানোর পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে উড়োজাহাজ সংকট সৃষ্টি করে সিডিউল ফ্লাইট নিয়েও যাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে তার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে বিমান বোর্ডের কিছু সদস্য ও বিমানের তিনজন প্রভাবশালী পরিচালক নেপথ্যে থেকে কাজ করছে বলেও জানা গেছে। সম্প্রতি বহিষ্কৃত কয়েকজন কর্মকর্তাও এদের ইন্ধন দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের ওই সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে বিষয়টি বিমানের বর্তমান ম্যানেজমেন্টকে হুশিয়ার করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার জন্যও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের নামসহ একটি প্রতিবেদন দেয়ার জন্যও নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। বিমানের মার্কেটিং শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে বিমান তীব্র আর্থিক সংকটে যাচ্ছে। তিন মাসের জন্য উড়োজাহাজ ভাড়া করলে প্রতি ঘণ্টার হিসেবে লিজদাতাকে যে টাকা দিতে হবে এক বছরের জন্য ভাড়া করলে সে টাকা অর্ধেকে নেমে আসবে। এতে উড়োজাহাজপ্রতি বিমানের সাশ্রয় হবে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে হজের পর সিডিউল ফ্লাইট চালাতেও বিমানকে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে না। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বিমানের ওই সিন্ডিকেট বড় ধরনের কমিশন বাণিজ্য ও নিজেদের উড়োজাহাজ ভাড়ায় আনার জন্য এক বছরের পরিবর্তে মাত্র তিন মাসের জন্য লিজ নেয়ার পাঁয়তারা করছে। অভিযোগ রয়েছে, এর অংশ হিসেবে একটি অখ্যাত ও নামসর্বস্ব কোম্পানির কাছ থেকে উড়োজাহাজ নেয়ার জন্যও ওই সিন্ডিকেট উঠেপড়ে লেগেছে। নাইজেরিয়াভিত্তিক একটি বিমান কোম্পানির বিরুদ্ধে এর আগে নানা প্রতারণার অভিযোগ থাকলেও সিন্ডিকেট ওই কোম্পানির সৌদি আরবের এজেন্টকে বাংলাদেশে ডেকে এনেছে। তীব্র উড়োজাহাজ সংকট : দুটি বোয়িং ৭৭৭ বহরে যোগ হওয়ার পর বিমানে উড়োজাহাজ সংকট কিছুদিন কেটে গিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি আবার মারাÍক উড়োজাহাজ সংকটে পড়েছে বিমান। আর্থিক সংকটের কারণে বোয়িং কোম্পানির কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পারায় আগামী বছরের অক্টোবরে যে দুটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ উড়োজাহাজ ঢাকায় আসার কথা ছিল সেগুলো ২০১৪ সালের আগে দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে বোয়িং। পরিচালনা পর্ষদ ও বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একগুঁয়েমির কারণে ৫ মাস ধরে একটি এয়ারবাস সিঙ্গাপুরে পড়ে আছে। যথাসময়ে সিদ্ধান্ত দিতে না পারায় এখন ২.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হবে বিমানকে। এছাড়া এয়ারবাসটি বহরে না থাকায় এ পর্যন্ত ৫০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। অপরদিকে একটি ডিসি-১০ উড়োজাহাজ প্রায় চার মাস ধরে পড়ে আছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গারে। ইঞ্জিন না থাকায় এটি সচল করা যাচ্ছে না। লিজে আনা একটি এয়ারবাস ও একটি বোয়িং ৭৪৭ এয়ারক্রাফট ফেরত চলে যাচ্ছে। একটি এফ-২৮ জাহাজ বহর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে মেরামত করতে দেয়া ২টি ইঞ্জিন আনতে পারছে না। কবে নাগাদ এটি সচল হবে, তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। আরেকটি ডিসি-১০ মেরামতের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে করুণ অবস্থা বিমানের। বিমানবহরে মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা ১২টি। এর মধ্যে ৪টি বন্ধ ও ২টি ইঞ্জিন দেশের বাইরে। অর্থাৎ অর্ধেক উড়োজাহাজ বর্তমানে পরিচালনার অযোগ্য। এ অবস্থায় প্রতিদিনই সিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটছে বিমানের বিভিন্ন স্টেশনে।