স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড স্টাফরা [ শেষের পাতা ] 16/02/2017
উড়োজাহাজের উচ্চমাত্রার শব্দ
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড স্টাফরা
মনজুরুল ইসলাম  :

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড সার্ভিসে কাজ করতেন বজলুর কবির। চাকরি থেকে অবসরের পর দীর্ঘদিন কানের সমস্যায় ভুগে সম্প্রতি মৃত্যু হয় তার। উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা বজলুর কবিরের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিমানবন্দরের গ্রাউন্ডে কাজ করে শ্রবণশক্তির প্রায় পুরোটা হারিয়েছিলেন তিনি। বজলুর কবিরের মতো দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড স্টাফ হিসেবে কর্মরতদের অধিকাংশই উড়োজাহাজের ইঞ্জিন-সৃষ্ট উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে স্থায়ী বধিরতাসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

শব্দের মাত্রা ৮৫ ডেসিবল বা তার বেশি হলে তা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু উড়োজাহাজের ইঞ্জিন থেকে আসা শব্দের মাত্রা থাকে ১০০ ডেসিবলের বেশি। উচ্চমাত্রার এ শব্দদূষণ থেকে বাঁচতে বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড স্টাফদের পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু দেশের বিমানবন্দরে কর্মরত গ্রাউন্ড স্টাফরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি মেনে চলছেন না। এ অবস্থায় বিমানবন্দরগুলোয় কর্মরত প্রকৌশলী, গ্রাউন্ড সার্ভিসসহ নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
জানা গেছে, টার্বো-প্রপেলার উড়োজাহাজের ইঞ্জিন থেকে ১০০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ উত্পন্ন হয়। জেট ইঞ্জিনচালিত উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে এর মাত্রা আরো বেশি। সেক্ষেত্রে ১১০-১২০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ উত্পন্ন হয়। এ হিসাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ওঠানামা করা অধিকাংশ উড়োজাহাজ থেকে ১০০-১২০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ উত্পন্ন হয়। কিন্তু বাধ্যবাধকতা থাকলেও ট্যাক্সিওয়ে, রানওয়ে, হ্যাংগারসহ বিমানবন্দরগুলোর ভেতরে কর্মরত ব্যক্তিদের অধিকাংশই শ্রবণেন্দ্রীয়ের সুরক্ষায় পিপিই ব্যবহার করেন না।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক কাজী ইকবাল করিম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, উড়োজাহাজের উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে। তবে এজন্য প্রতিরোধের ব্যবস্থাও রয়েছে। তিনি বলেন, গ্রাউন্ড স্টাফদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় কী কী সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে হবে, তা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দিকনির্দেশনায় বলা আছে। আর কর্মক্ষেত্রে গ্রাউন্ড স্টাফরা এগুলো যথাযথভাবে মেনে চলছেন কিনা, তা তদারকির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষের।

শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড সার্ভিসের দায়িত্বে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বিমানবন্দরটিতে রাষ্ট্রীয় এ এয়ারলাইনসের মোট ৮০০ গ্রাউন্ড স্টাফ রয়েছেন। প্রতিদিন চারটি শিফটে ২০০ করে কর্মী বিমানবন্দরটির গ্রাউন্ড সার্ভিসের কাজে নিয়োজিত থাকেন। এছাড়া প্রতিটি দেশীয় এয়ারলাইনসের নিজ নিজ গ্রাউন্ড স্টাফ ও টেকনিশিয়ান রয়েছেন বিমানবন্দরে। একই সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরাও বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে কাজ করেন। সব মিলিয়ে বিমানবন্দরটির গ্রাউন্ড সার্ভিসে কর্মরত জনবলের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। কিন্তু এসব কর্মীর অধিকাংশই পিপিই ব্যবহার করেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ বলেন, ট্যাক্সিওয়ে, রানওয়ে ও হ্যাংগারে কর্মরত প্রত্যেকেরই পিপিই ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তিনি বলেন, এমনকি পিপিই ব্যবহারের পরও দীর্ঘদিন উচ্চশব্দের মধ্যে থাকলে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শাহজালাল বিমানবন্দরে কর্মরত উড়োজাহাজ প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ উড়োজাহাজে শব্দের মাত্রা ১০০-১২০ ডেসিবল হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করে কিছুটা কমানো সম্ভব। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার হানিফ এ বিষয়ে বলেন, উড়োজাহাজের নির্ধারিত মাত্রার বেশি শব্দ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এ বিষয়ে উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও কিছু নির্দেশনা থাকে। সেগুলো মেনে চলা গেলে উড্ডয়ন-অবতরণকালে শব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে পিপিই ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। অনেক সময়ই গ্রাউন্ড স্টাফরা খামখেয়ালিবশত পিপিই ব্যবহার করেন না।

এক্ষেত্রে বিমানবন্দরে কর্মরতদের সচেতনতার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম। তিনি বলেন, উচ্চশব্দের কারণে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, তা না জানার কারণেই অনেকে সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। এজন্য কর্তৃপক্ষকে আগে কর্মীদের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতির বিষয়টি জানলে গ্রাউন্ড স্টাফরা নিজ উদ্যোগেই পিপিই ব্যবহার করবেন। তিনি বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে কর্মরত গ্রাউন্ড স্টাফদের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় অবকাঠামোস্বল্পতাও রয়েছে।

শুধু বিমানবন্দরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, উচ্চশব্দের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বিমানবন্দর-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারাও। শাহজালাল বিমানবন্দরের আশপাশ এলাকায় বাস করে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। এসব এলাকার বাসিন্দারা শ্রবণেন্দ্রীয়ের সমস্যার পাশাপাশি হূদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিতেও রয়েছে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের অধ্যাপক এবং নাক, কান ও গলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মনি লাল আইচ লিটু জানান, আমাদের মতো দেশে স্বাস্থ্যসচেতনতাকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। এ কারণে বিমানবন্দরের আশপাশ এলাকার বাসিন্দাদের শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়া কিংবা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার কারণ অনুসন্ধান হয় না। বিশেষ করে ফাইটার উড়োজাহাজগুলোর উচ্চমাত্রার শব্দ থেকে বেশি ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। দেশে এ নিয়ে কোনো গবেষণাও নেই।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পৃথিবীর অনেক দেশেই জনমানবহীন এলাকায় বিমানবন্দর গড়ে তোলা হয়। আবার যেসব বিমানবন্দরের আশপাশে হালকা বসতি রয়েছে, সেসব বিমানবন্দরে রাতে ফ্লাইট উড্ডয়ন ও অবতরণ বন্ধ রাখা হয়।
 
 
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Today's Other News
• শাহজালাল বিমানবন্দর নিরাপত্তা জোরদারে
• আমিরাতে ৭ লাখ কর্মী আকামা পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছেন
• লিজ নেয়া দুই উড়োজাহাজ নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড ॥ মাসে গচ্চা ৯ কোটি
• রিয়াদ সম্মেলনে অংশ নেয়ায় জনশক্তি রফতানির পথ প্রশস্ত হবে
More
Related Stories
News Source Link
            Top
            Top
 
Home / About Us / Benifits / Invite a Friend / Policy
Copyright © Hawker 2013-2012, Allright Reserved
free counters