বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লোকসান [ প্রথম পাতা ] 21/03/2017
বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লোকসান
হাছান আদনান  :
রিজার্ভে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় লোকসান করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈদেশিক মুদ্রা পুনর্মূল্যায়নে গত দুই অর্থবছরে লোকসান (উসুলকৃত ও অউসুলকৃত) হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। যদিও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় তার আগের বছরগুলোয় মুনাফায় ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

স্বর্ণ ও রৌপ্যর পাশাপাশি ছয়টি বিদেশী মুদ্রায় রিজার্ভ সংরক্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সিংহভাগ রিজার্ভই রাখা হয় মার্কিন ডলারে। এর বাইরে ব্রিটিশ পাউন্ড, অস্ট্রেলিয়ান ডলার, কানাডিয়ান ডলার, ইউরো ও জাপানি মুদ্রা ইয়েনেও রিজার্ভ রাখা হয়। ব্রেক্সিটসহ বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডলারের বিপরীতে রিজার্ভে রক্ষিত পাঁচটি মুদ্রারই অবমূল্যায়ন হয়েছে। এরই প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রা পুনর্মূল্যায়নজনিত আয়ে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর রিজার্ভে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা পুনর্মূল্যায়নজনিত ক্ষতির (উসুলকৃত ও অউসুলকৃত) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে উসুলকৃত ক্ষতির পরিমাণ ৮৫ কোটি টাকা। মুদ্রা ছেড়ে দেয়ায় এ টাকা আর ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। বাকি ৫৩৪ কোটি টাকা এখনো অউসুলকৃত হিসেবে রয়েছে। ডলারের বিপরীতে অবমূল্যায়িত মুদ্রাগুলোর দর বাড়লে এ ক্ষতি কমে আসবে।

গত অর্থবছরের মতোই ২০১৪-১৫ অর্থবছরও বৈদেশিক মুদ্রা পুনর্মূল্যায়নজনিত বড় অংকের লোকসান করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থবছরটিতে এ বাবদ লোকসান ছিল ৩ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে উসুলকৃত ক্ষতির পরিমাণ ৯ কোটি ৬২ লাখ ও অউসুলকৃত ৩ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা।

বৈদেশিক মুদ্রা পুনর্মূল্যায়নজনিত এ লোকসানকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি উত্তরণে অস্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রায় রিজার্ভ রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার কথাও বলছেন তারা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ডলারের দাম বাড়তে থাকলে রিজার্ভের ৬০-৭০ শতাংশই মুদ্রাটিতে রাখা হয়। আবার ডলারের দাম নিম্নগামী হলে অন্যান্য মুদ্রায় ভাগাভাগি করে রিজার্ভ রাখা হয়। বিশ্ববাজার পরিস্থিতির ওপর যথার্থ নজর রাখতে ব্যর্থ হলে লোকসান হবেই। দুই বছর ধরেই ডলারের বিপরীতে ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডের দাম কমছে। এজন্য অস্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রায় রিজার্ভের অর্থ সংরক্ষণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে।

ডলারের বিপরীতে অন্যান্য বৃহত্ অর্থনীতির দেশগুলোর মুদ্রার মানে গত কয়েক বছর বড় ধরনের পতন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে ব্রিটিশ পাউন্ড। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ডলারের বিপরীতে ব্রিটিশ পাউন্ড অবমূল্যায়িত হয়েছে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গত অর্থবছর আরো অবমূল্যায়িত হয়েছে মুদ্রাটি। ২০১৫-১৬ অর্থবছর ডলারের বিপরীতে ব্রিটিশ পাউন্ড দর হারিয়েছে ১৫ দশমিক ২১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরও পাউন্ডের অবমূল্যায়নের এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

ডলারের বিপরীতে অবমূল্যায়িত হয়েছে রিজার্ভে রক্ষিত আরেক মুদ্রা ইউরোও। ২০১৪-১৫ অর্থবছর ডলারের বিপরীতে ইউরো দর হারিয়েছে ১৭ দশমিক ৬৭ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছর ১ দশমিক ৫২ শতাংশ। এছাড়া গত অর্থবছর মার্কিন ডলারের বিপরীতে কানাডিয়ান ডলার অবমূল্যায়িত হয়েছে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছর মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৪ শতাংশ দর হারিয়েছিল মুদ্রাটি।

গত অর্থবছর অস্ট্রেলিয়ান ডলারের অবমূল্যায়ন হয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছর মার্কিন ডলারের বপরীতে মুদ্রাটি দর হারিয়েছিল ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছর জাপানি ইয়েনের ১৭ দশমিক ২১ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে।

কয়েক বছর ধরে ডলারের বিপরীতে প্রধান প্রধান মুদ্রার এ স্থিতিহীনতার কারণে রিজার্ভের মুদ্রা পুনর্মূল্যায়নজনিত ক্ষতি হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। ব্রেক্সিটের মতো বড় ঘটনায় ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডের ব্যাপক অবমূল্যায়ন হয়েছিল। তবে আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য এসব মুদ্রায় কিছু রিজার্ভ রাখতেই হবে।

তবে এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাংলাদেশ ব্যাংক অবমূল্যায়নের মুখে থাকা মুদ্রাগুলোয় রিজার্ভ সংরক্ষণ কমিয়ে আনতে পারে বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, সেটিও যথার্থ মূল্যায়নের ভিত্তিতে করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতে পাউন্ড, ইউরোসহ অন্যান্য মুদ্রার দাম বাড়তে পারে।

যদিও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরের আগ পর্যন্তও লাভে ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৩-১৪ অর্থবছর বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা পুনর্মূল্যায়নজনিত আয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ১১৩ কোটি টাকা অউসুলকৃত থাকলেও ২০০ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়। একইভাবে বৈদেশিক মুদ্রা পুনর্মূল্যায়নজনিত কারণে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২১৯ কোটি, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৫৪৩ কোটি, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৬৩১ কোটি ও ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২৮৪ কোটি টাকা মুনাফা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

উল্লেখ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অতিরিক্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্নভাবে বিনিয়োগ করে। এসব বিনিয়োগ থেকে প্রতি বছরই মোটা অংকের আয় হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইনভেস্টমেন্ট কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রিজার্ভে থাকা অর্থ বিভিন্ন মুদ্রায় রাখা হয়। কমিটির পক্ষ থেকে এটি নিয়মিতভাবে রিভিউ করা হয়।
 
 
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Today's Other News
• ইরানের সঙ্গে ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংকের 'না'
• সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার আরও কমানোর সিদ্ধান্ত
• বগুড়ায় ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
• ব্যাংকঋণের সহজলভ্যতায় জনপ্রিয় হচ্ছে না বন্ড মার্কেট
• চার পরিচালককে বিভিন্ন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
• ব্যাংকে লেনদেনে কর দ্বিগুণ
• ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানসহ দুজনকে পদ থেকে অপসারণ
• এবার অগ্রণী ব্যাংকের সকালের পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত
• ফাঁসলেন সিটি ব্যাংকের ব্যাবস্থাপক অব্যাহতি পেলেন গ্রাহক
• নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থ ৬ ব্যাংক
More
Related Stories
News Source Link
            Top
            Top
 
Home / About Us / Benifits / Invite a Friend / Policy
Copyright © Hawker 2013-2012, Allright Reserved
free counters