অপরাধী চক্রের সদস্যরা বিদেশে প্রশিক্ষিত [ শেষের পাতা ] 21/03/2017
এটিএম কার্ড জালিয়াতি
অপরাধী চক্রের সদস্যরা বিদেশে প্রশিক্ষিত
নিহাল হাসনাইন  :

ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়ন এবং ২৪ ঘণ্টা গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) কার্ড সার্ভিস চালু রয়েছে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোয়। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাংক গ্রাহকদের অর্থ চুরিতে তত্পর হয়ে উঠেছে জালিয়াত চক্র। এসব চক্রের সদস্যদের অনেকে এটিএম কার্ড জালিয়াতির জন্য বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছে বলেও তথ্য রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিদেশীদের দেশে এনেও এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করা হচ্ছে।

গত এক বছরে এটিএম জালিয়াতির অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনটি চক্রের ১৮ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী, এদের মধ্যে দুজন বিদেশী নাগরিকও রয়েছেন। এর মধ্যে র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন ১২ জন আর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে ধরা পড়েছেন ছয়জন।

চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এটিএম কার্ড জালিয়াত চক্রের ১১ সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব। এ চক্রের দলনেতার নাম শাহ আজিজ সোহেল। তিনি দুবাই থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে এটিএম কার্ড জালিয়াতি শুরু করেন।

র্যাব সূত্রে জানা গেছে, শাহ আজিজ সোহেল তিন বছরের বেশি সময় দুবাই থেকে কার্ড জালিয়াতির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তার প্রশিক্ষক ছিলেন মার্কিন নাগরিক এরিক লিমো। এক বছরের প্রশিক্ষণ শেষে বাকি দুই বছর দুবাইয়ে এটিএম কার্ড জালিয়াতি করেন শাহ আজিজ সোহেল। পরে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে ফিরে এখানে একটি এটিএম কার্ড জালিয়াত চক্র গড়ে তোলেন তিনি। তবে সেক্ষেত্রে তাদের সার্বিক নির্দেশনা দিতেন এরিক লিমো। এ চক্রে যুক্ত ছিলেন উত্তর সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স শাখার এক কর্মকর্তাও।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র্যাবকে শাহ আজিজ সোহেল জানান, সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স শাখার ওই কর্মকর্তার কাজ ছিল অভিজাত বিভিন্ন বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক  স্থাপন করে তাদের সোয়াপ মেশিন ব্যবহার করা। চক্রটি মূলত ব্যাংক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো খুঁজে বের করত। অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে কার্ডযুক্ত অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ জেনে তা হ্যাক করত তারা। পরে বিভিন্ন বিপণিবিতানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সোয়াপ মেশিনে ওই কার্ড ব্যবহার করে টাকা ক্যাশ করা হতো। এক্ষেত্রে জালিয়াতির মাধ্যমে চুরি করা অর্থের একটা অংশ সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও পেত। এভাবে এ চক্রটি প্রতি মাসে ব্যাংক গ্রাহকদের ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নিত।

এ বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, এটিএম কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এ চক্রটি অন্যান্য অপরাধী চক্রের মতো নয়। এদের কাজের ধরনে বেশ ভিন্নতা রয়েছে। এরা কখনই এটিএম বুথ থেকে অর্থ উত্তোলন করে না। তারা সব সময় ব্যবসায়ীদের সোয়াপ মেশিন ব্যবহার করেই অর্থ উত্তোলন করে থাকে। এছাড়া এরা খুব বেশি অংকের অর্থ কখনই উত্তোলন করে না।

তিনি আরো বলেন, শাহ আজিজ সোহেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমরা আরো বেশকিছু চক্রের তথ্য পেয়েছি, যাদের সঙ্গে দুবাইয়ে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় তার পরিচয় হয়। কিন্তু তারা কোন এলাকায় কাজ করে, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এসব চক্রের সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এটিএম কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গত বছরের মে মাসে এক চীনা নাগরিককে আটক করে র্যাব। তার নাম জ্যু জিয়ান হুই। প্রাইম ব্যাংকের এলিফ্যান্ট রোডের একটি এটিএম বুথে ক্লোন করা কার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলনের সময় তাকে হাতেনাতে আটক করা হয়।

র্যাবের গোয়েন্দা শাখার তথ্যমতে, এটিএম কার্ড জালিয়াত চক্রগুলো তিনটি স্তরে বিভক্ত হয়ে কাজ করে থাকে। প্রথম স্তরকে বলা হয় তথ্যসেল। এ সেলের সদস্যদের কাজ হলো, নানাভাবে এটিএম কার্ডের তথ্য সংগ্রহ করে টার্গেট সেট করা। দ্বিতীয় স্তরকে বলা হয় অপারেশনাল সেল। এ সেলে কাজ করেন জালিয়াত চক্রের দলনেতা। তার কাজ থাকে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে এটিএম কার্ডের গোপন নাম্বার হ্যাকড করা। সর্বশেষ স্তরকে বলা হয় কালেকশন সেল। এ সেলে কাজ করে থাকেন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা। এদের দায়িত্ব থাকে বিভিন্ন বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নির্দিষ্ট চুক্তিতে সোয়াপ মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা। তারা মনে করেন এটিএম বুথ থেকে জালিয়াতি করা কার্ড দিয়ে অর্থ উত্তোলন করতে গেলে সিসি ক্যামেরায় তাদের ভিডিও থেকে যেতে পারে। এ কারণেই  বিপণিবিতানের সোয়াপ মেশিন ব্যবহার করে থাকেন তারা।

কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া বিদেশীদের মধ্যে একজন পিয়তর। তিনি ইউক্রেনের বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিক। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে গুলশান এলাকার তিনটি এটিএম বুথ থেকে কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করেন তিনি। সিসি টিভি ফুটেজ দেখে ওই মাসেই রাজধানীর উত্তরা থেকে পিয়তরকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। সে সময় পিয়তর জানান, তার সঙ্গে কার্ড জালিয়াত চক্রের আরো সাত সদস্য রয়েছে। এদের মধ্যে দুজনই ইউক্রেনের নাগরিক। তারা হলেন এনডি ও রোমারিও। কিন্তু পিয়তর গ্রেফতার হওয়ার দুই সপ্তাহ আগেই ওই দুই বিদেশী দেশ ত্যাগ করায় তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তবে ওই চক্রের দেশী পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে ডিবি। তাদের মধ্যে তিনজন বেসরকারি ব্যাংক সিটি ব্যাংক লিমিটেডের কার্ড শাখার কর্মকর্তা। বাকি দুজন মার্চেন্ডাইজার।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, প্রিয়তরকে জিজ্ঞাসাবাদে শুধু ব্যাংক কর্মকর্তা বা কর্মচারী নয়, আরো বেশকিছু লোক জড়িত বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, ব্যাংকের কর্মকর্তা, হোটেল ব্যবসায়ী, মানি চেঞ্জিং প্রতিষ্ঠান ও ট্রাভেল এজেন্সির মালিকও রয়েছেন।

তিনি বলেন, এককভাবে কেউ টাকা হাতিয়ে নিতে পারে না। এটা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাউকে ছাড়াও সম্ভব নয়। এখানে ব্যাংকের কর্মকর্তা জড়িত থাকেন। এর সঙ্গে মার্চেন্ডাইজার জড়িত থাকেন, এর পর ওই ব্যক্তি। এ তিনপক্ষ মিলেই মূলত ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়।
 
 
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Today's Other News
More
Related Stories
News Source Link
            Top
            Top
 
Home / About Us / Benifits / Invite a Friend / Policy
Copyright © Hawker 2013-2012, Allright Reserved
free counters