মোবাইল ফোনের কাছে হার মানছে টেলিফোন [ প্রথম পাতা ] 17/05/2017
মোবাইল ফোনের কাছে হার মানছে টেলিফোন
নাজমুল লিখন:

নব্বইয়ের দশকে যে কয়েকশ’ ব্যবহারকারী নিয়ে দেশে মোবাইল ফোন চালু হয় এখন তা প্রায় ১৩ কোটিতে পৌঁছেছে। কিন্তু প্রতিযোগিতার দৌড়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছে এক সময়ের একমাত্র টেলিযোগাযোগ মাধ্যম টেলিফোন। টেলিফোন বা ল্যান্ডফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলের (সাবেক টিঅ্যান্ডটি) গ্রাহক কমতে কমতে সাড়ে ৮ লাখের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উল্টো পথে হাঁটছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে মোবাইল ফোন গ্রাহক বৃদ্ধি বাড়লেও সাশ্রয়ী দামে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা এখনও স্বপ্ন।

এমন পরিস্থিতিতে আজ ১৯৩টি দেশের মতো বাংলাদেশেও উদযাপিত হচ্ছে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্যসংঘ দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘বিগ ডাটা ফর বিগ ইমপ্যাক্ট’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ ও আইটিইউর মহাসচিব পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়া আয়োজন করা হয়েছে নানা অনুষ্ঠানের।

গত কয়েক বছরে দেশে মোবাইল ফোন বিপ্লব হয়েছে। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নয়ন হয়েছে। এক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্যই বেশি। সে তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারেনি। অথচ সবধরনের সক্ষমতা রয়েছে তাদের।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বার সকালের খবরকে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার কাঙ্ক্ষিত প্রসার হয়নি। ইন্টারনেটের দাম এখনও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। টেলিযোগাযোগ খাতের কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। মূলত তাদের দক্ষতার অভাবের কারণেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অন্য সমস্যাগুলো তো রয়েছেই।

দেশে নব্বইয়ের দশকে মোবাইল ফোন এলেও মূলত ১৯৯৬ সালের পর থেকে এর গ্রাহক বাড়তে থাকে। কিন্তু একটা সময় শহর-গঞ্জে টিঅ্যান্ডটি ল্যান্ডফোনের দোকানে চোখে পড়ত মানুষের লম্বা লাইন। এই ল্যান্ডফোনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাখো মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আর আবেগ-অনুভূতি। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে বিটিসিএল সেবা খাতের উন্নয়ন ঘটেনি; বরং ভাটা পড়েছে। ফলে টেলিফোন থেকে মুখ ফিরিয়ে গ্রাহকরা ঝুঁকছে মোবাইল ফোনের দিকে। প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিয়েও দাঁড়াতেই পারছে না বিটিসিএল; বরং প্রতিবছরই কমছে গ্রাহক, বাড়ছে লোকসান।

বিটিসিএল সূত্র জানায়, ২০১১ সাল পর্যন্ত টেলিফোন গ্রাহক বেড়েছে। তখন ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৩৮৬টি সংযোগ সক্ষমতার স্থলে গ্রাহক ৯ লাখ ৯০ হাজার ৪৯৪। সংযোগের সক্ষমতা বেড়ে এখন প্রায় ১৫ লাখ হলেও উল্টো গ্রাহক কমে সাড়ে ৮ লাখের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। এই সংযোগের প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনোভাবে অকার্যকর-এমন অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৬২ কোটি ৮৪ হাজার ৩৩৮ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২৮৩ কোটি ২৩ লাখ ১৪ হাজার ৭৩১ টাকা এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৮ কোটি ৩৪ লাখ ২৬ হাজার ৭৫০ টাকা।
বিটিসিএলের কর্তারা বলছেন, টেলিফোনের ক্ষেত্রে মূল অসুবিধাই হল গ্রাহকের চাহিদার পরিবর্তন। তারা এখন আর চান না, এক জায়গাতেই ফোন থাকুক। এ কারণে টেলিফোন থেকে মুখ ফিরিয়ে মোবাইল ফোনের দিকে ঝুঁকছে মানুষ।
তবে অনেকেরই অভিযোগ, কর্তারা যাই বলুন না কেন, গ্রাহক সংখ্যা কমার পেছনে আরেকটি কারণও রয়েছে। তা হল বিটিসিএলের কর্মসংস্কৃতি। গ্রাহকদের অভিযোগ, বিটিসিএলের কোনো যন্ত্র একবার খারাপ হলে তা মেরামতের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে কর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, সরকারি ফাইলের লাল ফিতায় ফেঁসেই কাজের দেরি আর কর্মীদের মানসিকতা। এর বাইরে অনিয়ম-দুর্নীতি তো রয়েছেই।
আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্পের পরিচালক রেজা সেলিম বলেন, এখন ল্যান্ডফোন প্রায় অকেজো। সব টাকা চলে যাচ্ছে মোবাইল অপারেটরদের কাছে। অথচ কম খরচে কথা বলার জন্য এই ল্যান্ডফোন খুবই দরকার। কিন্তু এ নিয়ে বিটিসিএলের মাথাব্যথা নেই। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট খুব প্রয়োজন হলেও এখন তা একটা গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তিনি বলেন, সারাদেশে যেখানেই বিটিসিএলের টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, সেখানেই উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবস্থা রয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এসব স্থাপনা করা হলেও কোনো কাজে লাগানো হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশের একটা বড় অংশই ফেসবুক কিংবা গেম খেলে সময় পার করে। এতে তথ্যপ্রযুক্তির প্রকৃত উন্নয়ন হবে না। তাদের কাজ করার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি প্রযুক্তির শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের সবকিছুর অগ্রগতির মূলে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট। কিন্তু এটি সেভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে না। ২০০৯ সালে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ মানুষের কাছে ব্রডব্যান্ড পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও তার অর্ধেকও সম্ভব হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির জন্য দরকার অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি আর পলিসি সাপোর্ট। কিন্তু এখনও এসব সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে সারাদেশের জিনিসগুলো পাচ্ছি না।
 
 
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Today's Other News
• বাংলালিংককে ১৭ কোটি টাকা জরিমানা
• গ্রামীণফোনের আইটি পরিচালনার দায়িত্ব পেল ভারতের উইপ্রো
• দিল্লিতে একত্র হচ্ছেন টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিরা
More
Related Stories
News Source Link
            Top
            Top
 
Home / About Us / Benifits / Invite a Friend / Policy
Copyright © Hawker 2013-2012, Allright Reserved
free counters