জমির সরকারি দাম পুনর্নির্ধারণ হচ্ছে [ প্রথম পাতা ] 29/05/2017
জমির সরকারি দাম পুনর্নির্ধারণ হচ্ছে
সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজধানীতে তাঁর শ্বশুরবাড়ি সূত্রে একটি ফ্ল্যাট পেয়েছিলেন। ফ্ল্যাটটি তিনি এক কোটি টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু অতিরিক্ত রেজিস্ট্রেশন ফির কারণে ক্রেতা দলিলে মূল্য দেখিয়েছেন ৩০ লাখ টাকা। এতে একদিকে সরকার কম রাজস্ব পেয়েছে এবং মন্ত্রীর ওই বন্ধুর ৭০ লাখ টাকা পরিণত হয়েছে কালো টাকায়। এ টাকা ‘সাদা’ করার কোনো পথ পাচ্ছিলেন না ভদ্রলোক। অগত্যা তিনি মন্ত্রীর কাছে পুরো বিষয় খোলাসা করে ওই টাকা সাদা করার উপায় জানতে চান। তবে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীও বন্ধুকে বাতলানোর মতো কোনো পথ খুঁজে পাননি।

বাংলাদেশে বেশির ভাগ জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচায় দলিলের অবস্থা এখন এ রকমই। সরকার নির্ধারিত উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ফির কারণে ক্রয়মূল্যের অনেক কম দাম দেখিয়ে দলিল করছে ক্রেতারা। ফলে বৈধভাবে আয় করা অনেক অর্থ-সম্পদই অবৈধ হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কেবল কম দাম দেখিয়ে দলিল করাই নয়, উচ্চহারে রেজিস্ট্রেশন ফি ও সরকার নির্ধারিত জমির ‘আজগুবি’ মূল্য নির্ধারণের কারণে অনেকে জমি কিনে রেজিস্ট্রেশনও করছে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ক্রেতা যে মূল্যে জমি কিনেছে, সরকার নির্ধারিত মূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি। ফলে জমির দামের প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ অর্থ ওই ক্রেতাকে খরচ করতে হয় রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ। আবার অনেক এলাকায় জমির দাম এত কম নির্ধারণ করা আছে, যেখানে প্রকৃত ক্রয়মূল্যের তুলনায় সরকার নির্ধারিত দর অনেক অনেক কম। সেখানকার ক্রেতারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে দলিল করছে। ফলে শহরে কালো টাকা সৃষ্টি হচ্ছে, আর গ্রামের মানুষকে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দরে দলিল করতে হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), আইন মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০১১ সালে সরকারি কর্মকর্তারা ঢাকার এসি রুমে বসে আজগুবি ধারণা নিয়ে জমির মূল্য নির্ধারণ করেন। ওই সময় একটি মৌজা বা দাগ নম্বরে যত জমি আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে দামি জমি ও সবচেয়ে কম দামের জমির মূল্যের গড় দাম ওই দাগ বা মৌজার জমির সরকারি মূল্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ফলে সরকার নির্ধারিত মূল্য কমদামি জমির প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি হয় এবং সর্বোচ্চ দামি মূল্যের জমির চেয়ে অনেক কম হয়। এ কারণে সরকার নির্ধারিত জমির মূল্যের চেয়ে কম মূল্যের জমি বেচাকেনা হলেও রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হিসাব করে দেখেছেন, ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সারা দেশে জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশনের পরিমাণ আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক কমে গেছে। রেজিস্ট্রেশন অনেক কমে যাওয়ায় রেজিস্ট্রেশন ফি বাড়ানোর পরও এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার বদলে আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে।

এ অবস্থায় জমির মূল্য নির্ধারণ, জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন ফি পর্যালোচনা করতে গতকাল রবিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে উচ্চ পর্যায়ের আন্ত মন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। বৈঠকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মেছবাহ উল আলম, এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান, স্থানীয় সরকার সচিব আবদুল মালেক, গণপূর্তসচিব শহীদ উল্লা খন্দকার উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, বৈঠকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের উপজেলাওয়ারি দাগ ও মৌজা বিবেচনা করে জমির মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা এবং রেজিস্ট্রেশন খরচ কী পরিমাণ কমানো হলে ক্রেতা-বিক্রেতারা প্রকৃত মূল্যে দলিল করতে উৎসাহী হবে—এর সুপারিশ পেতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের সভাপতিত্বে একটি আন্ত মন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বৈঠকে জমির সরকার নির্ধারিত দাম এবং জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা জমির দাম ও রেজিস্ট্রেশন ফি পর্যালোচনা করেছি। কোনো কোনো স্থানে জমির দাম বাড়বে, আবার কোথাও কমবে। জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন ফিতে স্বচ্ছতা আনা হবে। ’

বৈঠকে উপস্থিত একজন সচিব কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশে জমি নিবন্ধনের ফি এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জমি নিবন্ধন করতে মোট দলিল মূল্যের প্রায় ১৪ থেকে সর্বাচ্চ ১৯ শতাংশ পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয়। অর্থাৎ জমির ক্রয়মূল্য ১০০ টাকা হলে রেজিস্ট্রেশনের সময় সরকারকে ১৪ থেকে ১৯ টাকা পর্যন্ত ফি দিতে হয়। আবার ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে সর্বনিম্ন ১২.৫ থেকে ১৫.৫ শতাংশ পর্যন্ত ফি ও অন্যান্য চার্জ দিতে হয়। রেজিস্ট্রেশন করতে অধিক খরচের কারণে মানুষ প্রকৃত মূল্য গোপন করে কম দাম দেখিয়ে কম খরচে রেজিস্ট্রেশন করছে। এতে সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, বিক্রেতার বৈধ অর্থ অবৈধ হচ্ছে আবার ক্রেতাও তার সম্পদের প্রকৃত মূল্য গোপন করছে। রেজিস্ট্রেশন খরচ কমিয়ে নির্ধারণ করা হলে সব পক্ষই স্বচ্ছতার সঙ্গে দলিল করবে, তাতে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে সরকার জমির দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে। সর্বশেষ নির্ধারণ করেছে ২০১১ সালে। এর পর থেকেই জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন কমেছে, এ খাত থেকে সরকারের আয়ও কমেছে। কারণ জমির দাম নির্ধারণ ও রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তবতা বিবেচনা করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সারা দেশের জমির দাম নির্ধারণ করায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের কেউ কেউ লাভবান হচ্ছে। আবার কেউ কেউ ক্ষতির আশঙ্কায় দলিলই করছে না।

ওই কর্মকর্তা বলেন, জমির মূল্য এবং জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন ফি পুনর্নির্ধারণ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর কাছে মতামত চাওয়া হয়েছিল। গতকাল পর্যন্ত শুধু রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মতামত পাওয়া গেছে। বাকিদের মতামত পাওয়ার পর সেগুলোও পর্যালোচনা করবে নবগঠিত আন্ত মন্ত্রণালয় কমিটি। এ ছাড়া কমিটি প্রতি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ওই উপজেলার সব দাগ ও মৌজার জমির শ্রেণীকরণ করে মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করবে। এসবের ভিত্তিতেই সরকার নতুন করে সারা দেশের জমির দাম পুনর্নির্ধারণ এবং জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারণ করবে।

সম্প্রতি কালের কণ্ঠ আয়োজিত ‘কেমন বাজেট চাই’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন বলেন, উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ফির কারণে ক্রেতারা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখিয়ে ফ্ল্যাট বা প্লটের রেজিস্ট্রেশন করছে। এ কারণে ফ্ল্যাট বা প্লট বিক্রেতার বৈধ অর্থও অবৈধ সম্পদে পরিণত হচ্ছে। এ সংকট কাটাতে তিনি রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর সুপারিশ করেন।

রিহ্যাবের প্রথম সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া মিলন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন করতে ক্রেতাকে ক্রয়মূল্যের কমপক্ষে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ অর্থ সরকারকে বিভিন্ন চার্জ ও ফি হিসেবে দিতে হয়। অর্থাৎ এক কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট দলিল করতে ১৪ লাখ থেকে ১৬ লাখ টাকা খরচ হয়। ফলে অনেক ক্রেতা দাম অর্ধেক কমিয়ে দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন খরচও অর্ধেকে নামায়। উচ্চ রেজিস্ট্রেশন খরচের কারণে অনেকে এখন আর ফ্ল্যাট কিনছে না। রিহ্যাব সদস্যদের প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার সম্পূর্ণ প্রস্তুত (রেডি) ফ্ল্যাট এখনো অবিক্রীত রয়ে গেছে। আর যারা ফ্ল্যাট কিনছে, তাদের মধ্যে শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ রেজিস্ট্রেশন করছে না উচ্চহারে রেজিস্ট্রেশন ব্যয়ের কারণে। আগামী বাজেটে ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন খরচ বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে রিহ্যাবের।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে নানা রকম খরচ হয়। ঢাকায় রাজউকের ভেতরের জমি হলে একরকম খরচ, বাইরে হলে আরেক রকম। আবার পৌরসভার ভেতরে এক রকম হার, পৌরসভার বাইরে অন্য রকম হার। একই অবস্থা অন্য জেলাগুলোতেও। ফলে সারা দেশে ভূমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সরকারের ফি ও চার্জ সুনির্দিষ্ট অঙ্কে বলাও সম্ভব নয়।

সরকারের জাতীয় ই-তথ্য কোষ অনুযায়ী, কবলা বন্ধকি দলিল রেজিস্ট্রি ফির মধ্যে স্ট্যাম্প শুল্ক ক্রয়মূল্যের ৫ শতাংশ, রেজিস্ট্রি ফি ১-২৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রয়মূল্যের জন্য ৫০ টাকা, ২৫০১-৪০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রয়মূল্যের ২ শতাংশ এবং ৪০০১ টাকা বা তার বেশি হলে রেজিস্ট্রি ফি দিতে হবে বিক্রয়মূল্যের ২.৫ শতাংশ। এ ছাড়া হলফনামা ফি ৫০ টাকা, সিটি করপোরেশন, পৌর, টাউন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার জন্য পৌরকর ১ শতাংশ; সিটি করপোরেশন, পৌর, টাউন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার বাইরের জমির ক্ষেত্রে জেলা পরিষদ কর ১ শতাংশ ও ইউনিয়ন পরিষদ কর ১ শতাংশ; সিটি করপোরেশন, পৌর, টাউন বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডবহির্ভূত এলাকার এক লাখ টাকার অধিক বিক্রয়মূল্যের অকৃষি জমি বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রেতার উেস কর ৫ শতাংশ। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন, পৌর, টাউন বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডবহির্ভূত এলাকার বাইরের এক লাখ টাকার বেশি মূল্যের অকৃষি জমি বিক্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট রয়েছে ৫ শতাংশ। জমির বিক্রেতার ওপর এক থেকে দেড় শতাংশ হারে গেইন ট্যাক্স আরোপ করা আছে। নিয়ম অনুযায়ী এটি বিক্রেতার পরিশোধ করার কথা থাকলেও বাংলাদেশে জমির ক্রেতাকেই তা পরিশোধ করতে হয়।

বরিশালের একজন সাবরেজিস্ট্রার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভূমি রেজিস্ট্রেশন খরচের হিসাব এত জটিল যে আমাদেরও অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। একেক জমির রেজিস্ট্রেশন খরচ একেক রকম। বরিশালে এ হার ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে থাকে। আবার জমিটির ক্রেতা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা প্লট করে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে কিনলে সে ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্ককর দিতে হয়, যার হার বরিশালের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ। ঢাকায় অঞ্চল ভেদে এ হারে ভিন্নতা রয়েছে। আবার ঢাকার পরেই চট্টগ্রাম, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জে ভূমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ বেশি। ’
 
 
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Today's Other News
More
Related Stories
News Source Link
            Top
            Top
 
Home / About Us / Benifits / Invite a Friend / Policy
Copyright © Hawker 2013-2012, Allright Reserved
free counters