আরও পাঁচ বছর থাকবে অ্যাকর্ড [ প্রথম পাতা ] 16/06/2017
ইপিতে প্রস্তাব অনুমোদন
আরও পাঁচ বছর থাকবে অ্যাকর্ড
পোশাক খাতে বিপর্যয় নামবে : উদ্যোক্তারা * পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে : বাণিজ্যমন্ত্রী * আলোচনায় বসেই করণীয় ঠিক করা হবে : মান্নান কচি * সময়সীমার মধ্যে সংস্কার শেষ হলে থাকার অর্থ হয় না : সালাম মুর্শেদী
তৈরি পোশাক খাতের সংস্কার শেষ করার অজুহাত তুলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ব্র্যান্ড ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ডের বাংলাদেশে তদারকি ক্ষমতা আরও ৫ বছর বাড়ানোর প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট (ইপি)। বুধবার ফ্রান্সের স্ট্রসবার্গে ইইউ পার্লামেন্টে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে ‘সাসটেইনেবিলিটি কমপ্যাক্ট’ বাস্তবায়ন ইস্যুতে ওঠা প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় তা অনুমোদন পায়। শুধু মেয়াদ বৃদ্ধিই নয়, সাসটেইনেবিলিটি কমপ্যাক্ট বাস্তবায়ন ইস্যুতে বাংলাদেশের ওপর নজরদারি বাড়াতে সুপারিশ করা ১৬ দফার অনুমোদনও দেয়া হয়েছে এদিন।

প্রস্তাবে বলা হয়, অগ্নি ও ভবনের নিরাপত্তা ইস্যুতে অগ্রগতি হলেও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু উপশমের গতি ধীর। তাই এখনও উদ্বেগ রয়ে গেছে। সে কারণেই অ্যাকর্ডের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর জন্য ইপি সম্মতি দিচ্ছে। প্রস্তাবে অ্যাকর্ডকে বাংলাদেশের ‘পার্টনার’ অভিহিত করা হয়। সেইসঙ্গে অ্যাকর্ডকে সহায়তা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও এ দেশের ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

ইপিতে বাংলাদেশ সম্পর্কিত প্রস্তাব গৃহীত হলেও এ নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হননি সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এতদিন যারা অ্যাকর্ডের বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্য করেছিলেন, তারাও অনেকটা নিশ্চুপ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারাও মুখ বন্ধ করে আছেন। ফলে পোশাক খাতের সাধারণ উদ্যোক্তারা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে বেশ চিন্তায় পড়েছেন। তারা বলছেন, এ অবস্থায় চুপ থাকা মানে দেশের পোশাক খাতকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়া। ওই স্বেচ্ছাচারী ক্রেতা জোটের (অ্যাকর্ড) উচ্চাকাক্সক্ষাকে দমন করতে সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি বিজেএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদেরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান উদ্যোক্তারা।

অ্যাকর্ডের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে এতদিন ধরে পোশাক খাতের সংগঠনগুলোর নেতারা বলে আসছিলেন- বাংলাদেশের পোশাক খাতে এখন যে সংস্কার হয়েছে তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। এখন আর অ্যাকর্ডের তদারকির প্রয়োজন নেই। উদ্যোক্তারা নিজেরাই কারখানা সংস্কার করতে সক্ষম। নতুন করে এসব ক্রেতা জোট বাংলাদেশে থাকতে চাইলে তা মেনে না নেয়ার বিষয়টিও জোরালোভাবে বলছিলেন তারা। উদ্যোক্তাদের এ অবস্থানের সঙ্গে একমত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, অ্যাকর্ডের অনৈতিক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। ২০১৮ সালের ৩০ জুন মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সকে এক দিনও থাকতে দেয়া হবে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে কী আলোচনা হয়েছে বা অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেটা নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনও হয়নি। কারণ জেনেভায় আইএলও’র সম্মেলন চলছে। সেখানে আমাদের আইনমন্ত্রী রয়েছেন। তিনি দেশে আসুক। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছি। নিজেদের মধ্যে আগে আলোচনায় বসি। তারপর কোথায় কী হল বা কী করতে হবে একটা সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে।

বিজিএমইএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, অ্যাকর্ডের আওতাধীন বাংলাদেশের কারখানাগুলোর এখন পর্যন্ত রেমিডিয়েশন কাজ ৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। আইএলও’র মধ্যস্থতায় অ্যাকর্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মেয়াদ হচ্ছে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। এখন সংস্কারের বাকি কাজ যদি ওই সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে তো আর বাড়তি ব্যয় করে বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না। তবে কাজ শেষ না হলে অতিরিক্ত সময় হয়তো প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষরকারী পক্ষগুলোই ঠিক করবে কিভাবে কি করতে হবে।

এক প্রশ্নে তিনি বলেন, অ্যাকর্ডের ব্র্যান্ডদের বেশিরভাগই হচ্ছে ইইউভুক্ত। এদের আলোচনার প্লাটফর্ম হচ্ছে ইপি। সেখানে কমপ্লায়েন্স মান রক্ষায় ব্র্যান্ডদের সংগঠন অ্যাকর্ডের বাংলাদেশে আরও ৫ বছর থেকে যাওয়ার প্রস্তাবে অনুমোদন হওয়া মানে তাদের ইচ্ছার বিষয়টিকে ইইউর বৈধতা দেয়া। অর্থাৎ আগাম একটি অনুমোদন নিয়ে রাখা। যা সময় হলে তারা ব্যবহার করতে চাইবে।

এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সহসভাপতি এসএম মান্নান কচি যুগান্তরকে বলেন, তারা একটি অনুমোদন নিয়ে রেখেছে মাত্র। এটা কার্যকর করতে হলে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ইপি প্রতিনিধিদের আলোচনায় বসতে হবে। সেখানে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। তাতে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে সেটা প্রথমে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। তারপর সরকারের সঙ্গে বসে একটা সিদ্ধান্তে যাওয়ার পর হয়তো ক্রেতা জোটসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হবে। সেই আলোচনার আগেই যদি আমরা চুক্তির সময়সীমার মধ্যে সংস্কারের বাকি কাজ শেষ করে ফেলতে পারি তাহলে তো আর বাড়তি সময়ের প্রয়োজন হবে না।

ইপির এ সিদ্ধান্তের অনুলিপি ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিস, ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট/ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা নীতি ও পররাষ্ট্র বিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ, ইইউর মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সরকার ও সংসদ, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল এবং আইএলও মহাপরিচালকের কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে।

অস্ত্র ছাড়া সব পণ্যেই বাংলাদেশ ইইউর শুল্কমুক্ত রফতানির সুবিধা ভোগ করে থাকে। এ সুবিধা বহাল রাখার জন্য সাসটেইনেবিলিটি কমপ্যাক্টের বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করে ইপি। প্রস্তাবে বলা হয়, অ্যাকর্ডের মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতারা যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তা বাংলাদেশ সরকার এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে স্বীকার করতে হবে। ইপির কিছু কিছু সুপারিশে ‘বাংলাদেশে দায়িত্বশীল ব্যবসা’কে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কাজ উল্লেখ করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রথম সুপারিশে বলা হয়, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আকর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন করেছে। তবে এ অর্জনকে টেকসই করতে কাঠামোগত সংস্কার, রফতানি আরও বহুমুখী করা, সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিকদের অধিকার, পরিবেশগত সুরক্ষা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই জরুরি।

প্রস্তাবে ইপি পোশাক শিল্পে নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ, শ্রমিকের অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে কারখানা ও ভবনের নিরাপত্তায় আইনের বাস্তবায়ন জোরালো করতে হবে। শ্রম পরিদর্শন অধিদফতরের জন্য তহবিল বাড়ানো অব্যাহত রাখতে হবে। কারখানা পরিদর্শক নিয়োগ বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখতে হবে। কারখানাগুলো একবার পরিদর্শনের পর আবার তার ফলোআপ পরিদর্শনের পরিকল্পনা করতে হবে।

ইপির প্রস্তাবে ২০১৩ সালের শ্রম আইনের সংশোধনের সুপারিশ করে সমিতি করার স্বাধীনতা ও কালেকটিভ বার্গেইনিংয়ের সুযোগ সম্প্রসারণ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন দ্রুত করার সুযোগ বৃদ্ধি এবং ইউনিয়নবিরোধী অপরাধের তদন্ত ও বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সমিতি ও বার্গেইনিং এজেন্ট গড়ে তোলার জন্য আইএলও’র ৮৭ ও ৯৮ কনভেনশনের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের কথা বিবেচনায় নিয়ে ইপিজেডেও ট্রেড ইউনিয়ন করার পরিপূর্ণ অধিকার দিতে হবে। প্রস্তাবে বাংলাদেশ সরকার, পোশাক কারখানার মালিক ও সমিতির কর্ণধারদের পোশাক শিল্পে ত্রুটি মেরামত করার আহ্বান জানানো হয়। এগুলো আবার যথাযথভাবে ফলোআপ পরিদর্শনের ব্যবস্থাও করতে হবে।
প্রস্তাবের পঞ্চম দফায় অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে একটি বোর্ড গঠন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে মজুরি পুনরায় মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা প্রবর্তনের আহ্বান জানানো হয়। ষষ্ঠ দফায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ড, খুচরা বিক্রেতা এবং বাংলাদেশের বেসরকারি খাতকে শ্রম আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও সিএসআর পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, দায়িত্বশীল বাণিজ্য চর্চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পোশাক কর্মীদের জন্য শালীন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কোন কারখানা ভালো উৎপাদন করছে তার তথ্যও দিতে হবে। প্রস্তাবে বাংলাদেশ সরকার এবং বেসরকারি খাতকে ভিকটিমদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়। এতে করে কার্যকর নতুন কর্মসংস্থান কৌশল প্রবর্তন এবং উদ্যোক্তা গঠন ও জীবিকায়নের দক্ষতা প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দেয়া হয়।
 
 
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Today's Other News
• সংস্কার তদারকিতে নতুন প্ল্যাটফর্ম চায় অ্যালায়েন্স
• বাড়তি ৬ মাস থাকতে পারে অ্যালায়েন্স
• বিদ্যুত্-গ্যাসের অভাব :বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলো সংকটে
• নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে চায় অ্যালায়েন্স
More
Related Stories
News Source Link
            Top
            Top
 
Home / About Us / Benifits / Invite a Friend / Policy
Copyright © Hawker 2013-2012, Allright Reserved
free counters