রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি নিয়ে আইএমএফের গভীর উদ্বেগ [ প্রথম পাতা ] 14/11/2017
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি নিয়ে আইএমএফের গভীর উদ্বেগ
সুশাসন এবং জবাবদিহিতার অভাবেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের ব্যাপকতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। অধিক পরিমাণে খেলাপির কারণে লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারছে না সরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংক। মূলত সুশাসন এবং জবাবদিহিতার অভাবেই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এসব বিষয় নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করছে সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিরা। এসব বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি এ থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।

জানা গেছে, আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাবসহ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে ১২ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছে আইএমএফ। এছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতির সর্বশেষ অবস্থাসহ আর্থিক খাতের সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি জানতে অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছে ৬ সদস্যবিশিষ্ট আইএমএফ প্রতিনিধি দল। টানা এ বৈঠক চলবে আগামী ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইএমএফের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সোমবার যুগান্তরকে জানান, চলমান বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মূলত সরকারি ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতির কারণে এমনটি হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পেরে করা হচ্ছে অবলোপন। খেলাপির বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এতে প্রভিশন খেয়ে ফেলছে লাভের অংশ। সে কারণে সরকারি বেশ কিছু ব্যাংক লোকসানের ঘানি টেনে যাচ্ছে দীর্ঘদিন। এছাড়া মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে কয়েকটি সরকারি ব্যাংক। এসব সমস্যার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চেয়েছে আইএমএফ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব বিষয় ছাড়াও বৈঠকগুলোতে ঋণ ও আমানতের সুদহার, বেসরকারি আর্থিক খাত, নতুন ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন, আর্থিক খাতের সংস্কার, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এ সফরের আগেই সংস্থাটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। আইএমএফের অপর একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাপক তারল্য সংকট বিরাজমান এমন ব্যাংকের আমানতকারীদের কী হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ, ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন আপডেটসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর ১৭ পৃষ্ঠার একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বিভিন্ন ব্যাংকের নাজুক পরিস্থিতি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে সরকারি ব্যাংকগুলোর বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ব্যাংকে ব্যাসেল-৩ এর শর্তানুসারে ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ, সম্পদের গুণগত মান ও খেলাপি ঋণ কমানো, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করা, বড় ঋণ গ্রহীতাদের প্রতি নজরদারি বাড়ানো, কোর রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন অনুসরণ এবং ফোর্সড লোন কমানো। এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চার বছরে সরকারি ব্যাংকগুলোকে মূলধন ঘাটতির জোগান হিসেবে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার, যা সাধারণ মানুষের করের টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। গত চার বছরে ব্যাংকটি নিয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকার মূলধন। এছাড়া বেসিক ব্যাংক প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংক নিয়েছে ৩১০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোকে দেয়া হয়েছে।

তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে প্রায় ৩৪ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ২৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তথ্যে আরও দেখা যায়, মোট ঋণের ২৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই, যার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণ করা ১৩ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৭ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট খেলাপির প্রায় ৫৩ শতাংশ। বেসিক ব্যাংকের মোট খেলাপির ৯৯ শতাংশই আদায় অনিশ্চিত। এছাড়া ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি আছে ২ হাজার ২১০ কোটি টাকা।

সোনালী ব্যাংকের অবস্থাও খুব খারাপ। ব্যাংকটির বিতরণ করা ৩৩ হাজার ১০৬ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট খেলাপির ৩৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। তার থেকেও বড় দুঃসংবাদ হল- সোনালী ব্যাংকের মোট খেলাপির ৮৯ শতাংশই আদায় অনিশ্চিত। এছাড়া ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি আছে ২ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা। গত ৬ মাসে নিট লোকসান দিয়েছে ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা।

একইভাবে রূপালী ব্যাংকের বিতরণ করা ১৭ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৪ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট খেলাপির প্রায় ২৭ শতাংশ। রূপালী ব্যাংকের মোট খেলাপির ৮৮ শতাংশই আদায় অনিশ্চিত। এছাড়া ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি আছে ৭৪১ কোটি টাকা।
 
 
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Forward to Friend Print Close Add to Archive Personal Archive  
Today's Other News
• কৃষি ঋণে খেলাপির ৮৭% তিন ব্যাংকে
• প্রথম আলো পত্রিকায় ফারমার্স ব্যাংক সম্পর্কে প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গে
• তহবিল সঙ্কটে ব্যাংক
• অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডিসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
• অর্থ পাচার রোধে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে টাস্কফোর্স গঠন
• চার মাসে ছয় হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণ
• এলসি খোলায় নমনীয় হলো বাংলাদেশ ব্যাংক
• মানি লন্ডারিং ঝুঁকিতে ২০ ব্যাংক
• বিটিসিএলের টাকা ফেরত দিল ফারমার্স ব্যাংক
• মুন গ্রুপ চেয়ারম্যান ও ৭ ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল অনুমোদন
More
Related Stories
News Source Link
            Top
            Top
 
Home / About Us / Benifits / Invite a Friend / Policy
Copyright © Hawker 2013-2012, Allright Reserved
free counters