[ ] 2012-05-15 |
 |
|
| |
|
কিছু ধনীর হাতে চলে যাচ্ছে ব্যাংক-বীমার নিয়ন্ত্রণ
|
|
| |
| পরিচালকদের ২ শতাংশ শেয়ারের বাধ্যবাধকতা
আশরাফুল ইসলাম:
ধনিক শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে ব্যাংক ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এ সমস্যায় পড়েছেন বেশির ভাগ সাধারণ পরিচালক। এসইসি নীতিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালক হতে হলে তাকে বাধ্যতামূলক কোম্পানির কমপক্ষে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। নীতিমালা অনুযায়ী আগামী ২১ মের মধ্যে পরিচালকদের অ্যাকাউন্টে ২ শতাংশ শেয়ার চলে আসতে হবে। এ জন্য ক্রয় আদেশ দেয়ার সর্বশেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৮ মে। সময় যতই ঘনিয়ে আসছে সাধারণ পরিচালকদের মধ্যে উদ্বেগ-আতঙ্ক ততই বাড়ছে। কেননা এক হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের একটি ব্যাংকের প্রত্যেক পরিচালককে নীতিমালা অনুযায়ী কমপক্ষে ২০ কোটি টাকার শেয়ার ধারণ করতে হবে, যা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে কোম্পানির বেশির ভাগ শেয়ার চলে যাবে ধনীদের হাতে। মার্কেট শেয়ার হারাবে সাধারণ মানুষ। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বেশি পরিচালকবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধনিক শ্রেণীর পরিচালকদের হাতে চলে যাবে। কমে যাবে মার্কেট শেয়ার। অপর দিকে পদ ধরে রাখার জন্য পরিচালকেরা কৃত্রিমভাবে হস্তক্ষেপ করবেন। এতে বাজার চাঙ্গা হওয়ার পরিবর্তে আরো অবনতি হবে। জানা গেছে, গত ৯ ডিসেম্বর এক প্রজ্ঞাপন জারি করে এসইসি। এতে বলা হয়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির পরিচালকদের বাধ্যতামূলক কমপক্ষে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। আর এ জন্য ছয় মাসের সময় বেঁধে দেয়া হয়। এ সময়সীমা যতই ঘনিয়ে আসছে, বাজার ততই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। সময়সীমা অনুযায়ী আগামী ২১ মের মধ্যে ২ শতাংশ শেয়ার পরিচালকদের অ্যাকাউন্টে চলে আসতে হবে। আর এ জন্য ক্রয় আদেশ দিতে হবে ১৮ মের মধ্যে। এসইসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষে ব্যাংক ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির এক হাজার ৮৫৯ জন পরিচালকের শেয়ার ধারণ ২ শতাংশ ছিল না। পরে অনেকেই ক্রয়াদেশ দিয়েছেন। কৃত্রিমভাবে দরপতন ঘটিয়ে কম দামে অনেকেই ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এরপরও বেশির ভাগ পরিচালকই ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে পারেননি। এ দিকে এসইসির নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালককে ব্যক্তিগতভাবে কমপক্ষে ২ শতাংশ ও সম্মিলিতভাবে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। এসইসির এক পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী গত ফেব্রুয়ারির শেষে মিউচুয়াল ফান্ড বাদে এসইসির তালিকাভুক্ত ২৩৮টি কোম্পানির মধ্যে ৪৬টিরই সম্মিলিত শেয়ার ধারণ ৩০ শতাংশের নিচে ছিল। এসইসির নীতিমালা অনুযায়ী কোনো পরিচালকের শেয়ার ২ শতাংশের নিচে থাকলে এবং অন্য পরিচালকের শেয়ার ৫ শতাংশ বা তার বেশি থাকলে বার্ষিক সাধারণ সভায় ৫ শতাংশের শেয়ার ধারণকারীই কোম্পানির নতুন পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং ২ শতাংশের নিচে শেয়ার ধারণকারী পরিচালকের পদ হারাবেন। অপর দিকে সম্মিলিতভাবে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শেয়ার নেই এমন কোম্পানি মূলধন সম্প্রসারণের জন্য বাজার থেকে কোনো টাকা তুলতে পারবে না এবং এ শ্রেণীর কোম্পানির পরিচালকেরা বাজারে কোনো শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না। দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, এখন বেশির ভাগ ব্যাংকের পরিচালক ২০ জনের ওপরে রয়েছেন। কোনো কোনো ব্যাংকের ৩২ জনেরও ওপরে রয়েছেন। ব্যাংক অনুমোদনের সময় একজন পরিচালকের সর্বোচ্চ শেয়ার মূল্য ছিল এক কোটি টাকা। ১০ লাখ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকার মধ্যে বেশির ভাগ পরিচালকের শেয়ার ছিল। বর্তমানে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, একটি ব্যাংকের মূলধন কমপক্ষে ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত করতে হবে। তবে কোনো ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ৯ শতাংশ হারে ৪০০ কোটি টাকার বেশি হলে বর্ধিত হারে মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে। এ অনুযায়ী বড় বড় ব্যাংকগুলোর মূলধন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে এক হাজার কোটি টাকার বেশি। কারণ বড় ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ অন্য ব্যাংকের চেয়ে বেশি রয়েছে। এখন এক হাজার কোটি টাকার মূলধনের একটি ব্যাংকের প্রত্যেক পরিচালককে এসইসি নীতিমালা অনুযায়ী কমপক্ষে ২০ কোটি টাকার শেয়ার ধারণ করতে হবে। কিন্তু বেশির ভাগ ব্যাংক পরিচালকের ২০ কোটি টাকার সক্ষমতা নেই বলে জানিয়েছেন একজন উদ্যোক্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যাংক পরিচালক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, তারা ব্যাংকের লাইসেন্স নেয়ার সময় সর্বোচ্চ এক কোটি টাকার মূলধন ধারণ করেছিলেন। এখন ব্যাংক পরিচালকের পদ ধরে রাখার জন্য কমপক্ষে তাকে ২০ কোটি টাকার শেয়ার ধারণ করতে হবে, যা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এ ছাড়া ব্যাংক পরিচালকও বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে পরিচালকদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ দিকে আগের চেয়ে ব্যাংক পরিচালকের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। বাাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আমানতকারীদের স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২০০৩ সালে ব্যাংকের পরিচালকসংখ্যা সর্বোচ্চ ১৩ জনে নামিয়ে আনার জন্য একটি সার্কুলার জারি করা হয়। এই সার্কুলারের বৈধতা নিয়ে ব্যাংক উদ্যোক্তারা হাইকোর্টে রিট করেন। এতে সার্কুলারের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়া হয়। হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতার ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক আবার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। আপিলে হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারই কার্যকারিতা পায়। ২০০৪ সাল থেকে সার্কুলার বাস্তবায়নে বেশির ভাগ ব্যাংক পরিচালকসংখ্যা পর্যায়ক্রমে ১৩ জনে নামিয়ে আনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অধিকতর কার্যকর এবং সুস্পষ্ট করতে ২০০৭ সালে সরকার এক অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশে পরিচালকের মেয়াদ, সংখ্যা ও ব্যাংকের শেয়ার ধারণের ক্ষমতার বিষয়ে আরো স্পষ্ট করা হয়। অধ্যাদেশে বলা হয়, আমানতকারীদের মধ্য থেকে নিযুক্ত পরিচালক ছাড়া কোনো ব্যাংক কোম্পানিতে ১৩ জনের বেশি পরিচালক থাকবে না। অপর দিকে কোনো পরিবার ৫ শতাংশের বেশি শেয়ারের অধিকারী হলে ওই পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে অনধিক দুইজন পরিচালক থাকবেন এবং শেয়ার ৫ শতাংশের কম হলে একজন পরিচালক থাকবেন। আগে উদ্যোক্তা পরিচালকের সংখ্যা পরিচালকদের মোট সংখ্যার অর্ধেক অপেক্ষা কম হলে কোনো পরিচালক দুই মেয়াদে ছয় বছরের পর একাধিক্রমে তৃতীয় মেয়াদে আরো তিন বছর পরিচালক থাকতে পারত। কিন্তু সংশোধনীতে উল্লেখ করা হয়, একজন পরিচালক একাধিক্রমে দুই মেয়াদে ছয় বছরের বেশি পরিচালক থাকতে পারবে না। সংবিধান অনুযায়ী নবগঠিত সংসদ অধিবেশনের প্রথম এক মাসের মধ্যে কোনো অধ্যাদেশ আইনে পরিণত না হলে ওই অধ্যাদেশের কার্যকারিতা আর থাকবে না। অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে উত্থাপিত না হওয়ায় ২০০৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারায়। নতুন আইন বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো নির্দেশনা না দেয়ায় বিষয়টি এখন ঝুলে রয়েছে। এর পর থেকে যেসব ব্যাংক পরিচালকসংখ্যা ১৩-তে নামিয়ে এনেছিল তারা আবার পরিচালকের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। এখন ৩২ জনের বেশি পরিচালক রয়েছেন কোনো কোনো ব্যাংকের। পরিচালকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণের মার্কেট শেয়ার কমে যাবে বলে জানিয়েছেন পরিচালকেরা। বিশ্লেষকদের মতে, এসইসির নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হলে সাধারণের মার্কেট শেয়ার কমে যাবে, বাড়বে পরিচালকের শেয়ার। কেননা ৩২ জন পরিচালকবিশিষ্ট একটি ব্যাংকের ২ শতাংশ হারে ৬৪ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা চলে যাবে পরিচালকের হাতে। তবে পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মার্কেট শেয়ার কমে গেলেও বাজার অস্থিতিশীল হবে না। কারণ ব্যাংক পরিচালকেরা শেয়ারের দাম বেড়ে গেলে তাদের হাতে থাকা সব শেয়ার ছেড়ে দিতে পারবে না। তাদের স্বার্থেই তারা শেয়ার ধরে রাখবেন। বর্তমানে বেশির ভাগ পরিচালকের শেয়ার ১ শতাংশের নিচে। গত ২০১০ সালের ডিসেম্বরের আগে বাজার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ পরিচালকই তাদের শেয়ার ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাজার পড়ে যাওয়ার পর তাদের বেশির ভাগই শেয়ার কেনেননি। এ কারণে বাজার আজো আগের অবস্থানে ফিরে যায়নি। ব্যাংক বিশ্লেষকদের মতে, এসইসির এ ভ্রান্তনীতির কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত পরিচালনায় মেধার শূন্যতা সৃষ্টি হবে। কেননা নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে মেধার ভিত্তিতে নয়, টাকার পরিমাণের ভিত্তিতে পরিচালক হবেন। এতে কয়েক ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হবে। প্রথমত. যারা এতদিন দক্ষতার সাথে ব্যাংক পরিচালনা করে আসছিলেন তারা পরিচালক হিসেবে আর ব্যাংকে থাকতে পারবেন না। ব্যাংক চলে যাবে কয়েকটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। দ্বিতীয়ত. বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে যে সুশাসন বিরাজ করছে তা ভেঙে যাবে। কেননা, টাকাওয়ালা পরিচালকদের উদ্দেশ্যই থাকবে বেশি মুনাফা তুলে নেয়ার। এ কারণে তারা বেপরোয়া ব্যাংকিং করতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তৃতীয়ত. যেসব ব্যাংক পরিচালকদের শেয়ার কম ছিল বেশি শেয়ারধারণকারী পরিচালকেরা এ সুযোগটি কাজে লাগাবে। সব মিলে দেশের ব্যাংকিং খাত পরিচালনায় এক অরাজকতা সৃষ্টি হবে। এর প্রভাব গোটা অর্থনীতিকে বহন করতে হবে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, এটা আইনগত বিষয়। এক হাজার কোটি টাকার একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের দুই শতাংশ শেয়ার থাকতেই পারে। তবে এসইসির এ নীতিমালায় যারা সংুব্ধ হয়েছেন, তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। এটা দোষের কিছু নয়। দেশের তৃতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান গতকাল আক্ষেপ করে নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, দেশের ব্যাংকিং খাত পরিচালনায় দীর্ঘ দিন বর্তমান পরিচালকেরা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। বেশি শেয়ার ধারণ করে নয়, মেধারভিত্তিতে অনেক পরিচালক কম শেয়ার ধারণ করেও ব্যাংক পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। তারা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এসইসির নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে কম শেয়ারধারণকারীরা আর পরিচালকের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, ব্যাংকিং খাত হারাবে দক্ষ পরিচালকদের। বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে পরিচালকদের দুই শতাংশ শেয়ার ধারণের নীতিমালার বিপক্ষে। কারণ হিসেবে তিনি জানান, উচ্চশিক্ষিত, ব্যাংক পরিচালনায় সুদক্ষ পরিচালকদের নেতৃত্বের কারণে ইসলামী ব্যাংক দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংকের সুনাম অর্জন করতে পেরেছে। তিনি জানান, যাদের সুযোগ্য নেতৃত্বে ইসলামী ব্যাংক আজকের অবস্থানে এসেছে তাদের কারো দুই শতাংশ শেয়ার নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ১৫-২০ হাজার টাকার শেয়ার ধারণ করেও অতীতে এই ব্যাংকটির অনেকেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন বজায় রাখার জন্যই এ নীতিমালা পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। |
|