[ শেষ পাতা ] 02/08/2015
 
সোনালী ব্যাংকের আরও টাকা কেটে নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
গোলাম মওলা

দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় পর পরিশোধ করা হচ্ছে সোনালী ব্যাংকের দেয়া স্বীকৃত বিলের পাওনা। দীর্ঘ এ সময়ে স্বীকৃত বিলের অর্থ পরিশোধ থেকে বিরত থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের হিসাব থেকে এসব টাকা কেটে অন্য ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ১ হাজার ৫৭৯টি অভ্যন্তরীণ বিলের পাওনা পরিশোধ করা হবে। এ কারণে সোনালী ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি (এফসি) ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ সংরক্ষিত রাখতে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত এক চিঠি পাঠিয়ে এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, গত বছরের জুলাইতে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক হাজার ৫৭৯টি স্বীকৃত বিলমূল্যে পরিশোধে কয়েক দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত সেগুলো পরিশোধ করা হয়নি। এ বিষয়ে সর্বশেষ গত ৬ মে সোনালী ব্যাংক একটি ব্যাখ্যা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ওই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় প্রথম ধাপের ৩১৭টি ও দ্বিতীয় ধাপের ৬০৫টি বিলমূল্যে অন্য ব্যাংকে পরিশোধ করা হয়। এর আগে সোনালীর পর্ষদের অনাপত্তি দেয়া ৫৮৬টি বিলমূল্যে কেটে নিয়ে অন্য ব্যাংককে পরিশোধ করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত শনিবার যুগান্তরকে বলেন, আমাদের বোর্ড যেহেতু সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক কাজটিই করছে। তিনি বলেন, অনিয়ম বা জালিয়াতি না থাকলে বিল পরিশোধ করাই ভালো। তবে এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন কোম্পানির ব্যাপারে তথ্যের জন্য চিঠি দিয়েছে। পাশাপাশি ফরেন কারেন্সি (এফসি) ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ সংরক্ষিত রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। আমরা সে নির্দেশ মতো অর্থ জমা রেখেছি।

উল্লেখ্য, এক হাজার ৫৭৯টি স্বীকৃত বিলের বিপরীতে বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকের এক হাজার ১৬৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. আহসানউল্লাহ বলেন, বিল আটকে থাকায় ব্যাংক খাতে অনেক জটিলতাও হচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায় আমরা তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নিয়ে পরিশোধ করার ব্যবস্থা করেছি। কোনো মামলা-মোকদ্দমা ও জাল-জালিয়াতি নেই। সোনালী ব্যাংকের স্বীকৃতি দেয়া সব বিল পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর আগে আমরা ৫৮৬টি বিলের পাওনা পরিশোধ করেছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এসব বিলের মধ্যে ৫৮৬টি বিলে কোনো অনিয়ম না পাওয়ায় গত বছরের ডিসেম্বরে এসব বিলের অর্থ সোনালী ব্যাংকের হিসাব থেকে কেটে পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে ১৫৮টি বিলের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৬০ ডলার পরিশোধ করেছে। এছাড়া সোনালী ব্যাংক নিজেও ২২২টি বিল পরিশোধ করেছে। বাকি বিলগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক পরিশোধ করবে।
উল্লেখ্য, হল-মার্কসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সোনালী ব্যাংকের শেরাটন শাখা থেকে ২৩৩২টি অভ্যন্তরীণ বিলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ওই সময় সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে হলমার্কসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির মাধ্যমে তিন হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এদিকে দীর্ঘদিন স্বীকৃত বিলের অর্থ পরিশোধ থেকে সোনালী ব্যাংক বিরত থাকায় চরম খেসারত দিতে হয়েছে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের। এ ঘটনায় শিল্প উদ্যোক্তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।

জানা গেছে, হলমার্ক কেলেংকারির ঘটনায় ২০১২ সালের মে পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের শেরাটন হোটেল কর্পোরেট শাখায় সৃষ্ট স্থানীয় আমদানি-রফতানির বিপরীতে সোনালী ব্যাংকের স্বীকৃতি দেয়া বিলের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৪২টি। এর বিপরীতে ৪১টি ব্যাংকের এক হাজার ৩১৬ কোটি টাকা পাওনা ছিল। এই টাকা পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করার কথা থাকলেও সোনালী ব্যাংক বিলগুলো আটকে দেয়। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিলগুলো পরিশোধে মধ্যস্থতা করলেও সোনালী ব্যাংকের আপত্তির কারণে তা পরিশোধ হয়নি। এ ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৫৪টি মামলা করে দেশের ১১টি ব্যাংক। এর মধ্যে জনতা ব্যাংক করেছে ৭টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক করেছে ১টি, যমুনা ব্যাংক করেছে ৩টি, আইএফআইসি ব্যাংক করেছে ২টি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক করেছে ৬টি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক করেছে ২টি, ন্যাশনাল ব্যাংক করেছে ৮টি, উত্তরা ব্যাংক করেছে ৫টি, অগ্রণী ব্যাংক করেছে ১৬টি, সাউথইস্ট ব্যাংক ১টি এবং প্রাইম ব্যাংক করেছে ২টি মামলা। অবশেষে ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ কেটে পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

উল্লেখ্য, আমদানিকারকের ব্যাংকের স্বীকৃতি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে কমিশনের বিনিময়ে রফতানিকারকের বিল কেনে ব্যাংক। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম। এর মাধ্যমে আমদানিকারকের দায় সৃষ্টি হয়। তবে এ প্রক্রিয়ায় কিছু ব্যবসায়ী ভুয়া স্বীকৃত বিল তৈরি করে অন্য ব্যাংক থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়।