[ ] 11/01/2017
 
তবু লড়াইয়ের বিশ্বাস নিয়েই নামছে টেস্টের বাংলাদেশ
ওয়েলিংটন বিশ্বের সবচেয়ে ‘উইন্ডি টাউন’, শোঁ শোঁ বাতাসে শরীরের ভারসাম্য রাখাই কঠিন। সে শহরেরই মাঠ বেসিন রিজার্ভের সবুজ চত্বরে উইকেট আলাদা করে চেনা কঠিন।
আর প্রতিপক্ষ ঘরের মাঠের অদম্য নিউজিল্যান্ড। সফরকারী দলের মনে ভয়ের শীতল স্রোত বইয়ে দেওয়ার জন্য ম্যাচপূর্ব এমন আবহ যথেষ্ট।
তার পরও যদি ভীতিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে মন চায় তো জেনে রাখুন, আগামীকাল ভোরে শুরু হতে যাওয়া নিউজিল্যান্ড-বাংলাদেশ সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। তাতে সবুজ উইকেট আরো প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে ব্যাটসম্যানদের জন্য, এবারের সফরে ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টির সব ম্যাচ হারা বাংলাদেশ কোনো ব্যতিক্রম নয়।
কিন্তু গতকাল বেসিন রিজার্ভে বয়ে গেছে উল্টো হাওয়া। টেস্ট অভিষেকের সবুজ সংকেত পেয়ে যারপরনাই উচ্ছ্বসিত তাসকিন আহমেদ, ‘উইকেট দেখে পেসাররা খুব খুশি। সবুজ আর শক্ত উইকেট। এখানে বোলিং করার জন্য আমি মুখিয়ে আছি। আশা করি, এখানে আমরা ভালো বোলিং করব। ’ অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের মনেও আশার দোলা, ‘প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের বোলিং ইউনিটের আছে। ’ গত রাতে ঘরোয়া আড্ডায় বাংলদেশের ‘ওয়েলিংটন টেস্ট’ ঝুপ করে শেষ হয়ে যাওয়ার স্মৃতি মনে করিয়ে দিতেই সাকিব আল হাসানের সপ্রতিভ জবাব, ‘তিন দিনে শেষ হলে তো আমরাও জিততে পারি!’
এ তো গেল দলের ভয়ডরহীন শরীরী ভাষা। আশ্চর্যজনকভাবে তাওরাঙ্গা থেকে ওয়েলিংটনে পা রাখার পর থেকেই ক্রিকেটারদের কৌতূহলী প্রশ্ন, ‘সন্ধ্যার আগে ছাড়া খুব বাতাস তো হচ্ছে না। ’ উল্টো চড়া রোদ দেখে তামিম ইকবাল বিড়বিড় করেন, ‘আল্লাহ, ম্যাচেও যেন এমন আবহাওয়া থাকে। ’ দ্বিতীয় দিনে মাঠে এসে আরেকবার অবাক হওয়ার পালা বাংলাদেশ দলের, অবশেষে বাদামি রং নেওয়ায় আউট ফিল্ড থেকে আলাদা করা যাচ্ছে উইকেট। আজ ঘাস আরো ছাঁটা হবে, তাতে আরো দৃশ্যমান হবে বেসিন রিজার্ভের উইকেট হবে ভেবে ক্রমশ ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়েছে ব্যাটসম্যানদের মুখেও।
এই ব্যাটসম্যানদের দিকেই তাকিয়ে মুশফিকুর রহিম, ‘ব্যাটিংটা ভালো না হলে, স্কোরবোর্ডে বড় রান জমা না করতে পারলে বোলারদের কাজটা খুব কঠিন হয়ে যাবে। ব্যাটসম্যানদের রান করতেই হবে। ২০১০ সালে খেলা একমাত্র টেস্ট বাদ দিলে নিউজিল্যান্ডে সব সময়ই রানের জন্য ধুঁকেছে বাংলাদেশ। হ্যামিল্টনের সেই ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন মাহমুদ উল্লাহ ও সাকিব আল হাসান। ১২১ রানে হারলেও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ওই একটা টেস্টই পঞ্চম দিনে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। ব্যাটিং অর্ডারে তিনটি পরিবর্তন এলেও অভিজ্ঞতায় এগিয়ে বাংলাদেশের এখনকার ব্যাটিং ইউনিট। চোটের কারণে প্রথম ওয়ানডের পর লে-অফে চলে যাওয়া মুশফিক মাঠে ফেরার পূর্বমুহূর্তে এতটাই রোমাঞ্চিত যে মনে হলো বড় কিছু অপেক্ষা করছে তাঁর সামনে। ২০১৩ সালে ওয়েলিংটন ফায়ারবার্ডসে খেলার সুবাদে বেসিন রিজার্ভকে ঘিরে রোমাঞ্চ আছে তামিমেরও, তা যতই ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে এ মাঠে নিজের সব শেষ টেস্টে স্লিপে ক্যাচ নিতে গিয়ে বুড়ো আঙুল ভেঙে থাকুন না কেন। এবারও ক্যাচ নিয়ে গিয়ে পাওয়া চোটের শুশ্রূষা চালিয়ে যাচ্ছেন তামিম। এ দুটি ঘটনার আরেকটি অন্ত্যমিল হলো, দুইবারই ক্যাচ ছেড়েছেন তিনি।
ফিল্ডিং-ব্যাটিংয়ের চেয়ে এ বিভাগও কম উদ্বেগজনক নয় বাংলাদেশের জন্য। কন্ডিশনের কারণে স্লিপে তিনজন ফিল্ডার চাইবেনই পেসার। বোলারের দাবি না হয় মেটালেনও মুশফিক। কিন্তু বাংলাদেশ দলে কি তিনজন দক্ষ স্লিপ ফিল্ডার আছেন? নেই। তাতে ক্যাচ-ট্যাচ পড়লে খুব ভোগান্তি হয় টেস্ট ক্রিকেটে। ঠাণ্ডা এবং প্রতিটি বলের ওপর তীক্ষ্ন নজর রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মনোসংযোগের ঘাটতি নিয়ম করেই টেস্ট ক্রিকেটে ভুগিয়েছে বাংলাদেশকে।
অথচ প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড ফিল্ডিংয়ে দুর্দান্ত। পেস বোলিংয়ে ক্ষুরধার আর মুশফিক তো বলেই দিয়েছেন, ‘এমন কন্ডিশনে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা খেলে অভ্যস্ত। তারা জানে কিভাবে সব সামলাতে হয়। তাই আমাদের বোলারদের ভালো একটা জায়গায় টানা বল করে যেতে হবে। ’
মোটামুটি অনেকগুলো ‘টাস্ক’ সতীর্থদের দিয়েছেন মুশফিকুর রহিম। প্রথম দায়িত্বটা অবশ্যই ব্যাটসম্যানদের। বড় পুঁজি না হলে তো লড়াইয়ের চেষ্টাও বৃথা। ব্যাটসম্যানরা পুঁজি দিয়ে বোলারদের বুদ্ধি খাটিয়ে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন অধিনায়ক। সঙ্গে ফিল্ডিং থেকেও ভুলের মেদ ঝেড়ে ফেলতে হবে যতটা সম্ভব।
একটু কঠিনই। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে খেলা ৫ টেস্টের ৪টিতেই ইনিংস ব্যবধানে হারা বাংলাদেশের পক্ষে ভোজবাজির মতো পাল্টে যাওয়া কঠিনই। ওদিকে আবার চোখের অস্ত্রোপচার করিয়ে ফিরে এসেছেন রস টেলর। বাংলাদেশের বিপক্ষে সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের সিরিজে কেন দলে রাখা হয়নি—এ নিয়ে কাল প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিজ্ঞ এ কিউই ব্যাটসম্যান। তাতে মনে হলো, নিজ দেশের নির্বাচক কমিটির ওপর নিজের রাগটা তিনি ঝাড়বেন বাংলাদেশের ওপরই!
টেলর ব্যর্থ হলেই কি, কেন উইলিয়ামসন আছেন। বোলিংয়ে টিম সাউদি, ট্রেন্ট বোল্ট, ম্যাট হেনরিরা ক্রমাগত বল করবেন পাঁজর লক্ষ্য করে। তাতে ওয়েলিংটনে বাংলাদেশের আগের দুটি টেস্টের স্কোরকার্ড ফিরে আসছে স্মৃতিতে—দুটোতেই হার ইনিংস ব্যবধানে।
এবার সেই ধারা পাল্টানো নিয়ে বাড়তি কোনো চাপ নেই মুশফিকদের ওপর। তবে সামান্য প্রত্যাশা তো আছে—অন্তত লড়াইটা যেন করে বাংলাদেশ।