[ শেষের পাতা ] 11/01/2017
 
বাড়ছে উৎপাদন খরচ কমছে দাম
রুমানা রাখি :

দেশে একদিকে রপ্তানিমুখী পোশাকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে দাম কমছে। দুই বছরে রপ্তানিমুখী পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৭.১১ শতাংশ। একই সময়ে পোশাকের দাম কমেছে ৬২.৮৪ শতাংশ। ফলে পোশাক রপ্তানিকারকদের নিট আয় কমে গেছে। এ কারণে বেশিরভাগ পোশাক কারখানাই তারল্য সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ক্রেতাদের শর্ত বাস্তবায়নের জন্য কারখানার মানোন্নয়নে কাজ করতে হচ্ছে। আছে শ্রমিকদের বেতনভাতা বাড়ানো, ব্যাংকের দেনা শোধের চাপ। সব মিলিয়ে পোশাক খাত বেশ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এর আগে তাজরীন ও রানা প্লাজা ধসের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে এই খাতকে বেগ পেতে হয়েছে। সেই ধকল শেষ না হতেই এখন আসছে আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দার প্রভাব। এর মধ্যে আবার দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তবে রপ্তানির বাজার বড় হলেও উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ঠিক দাম পাচ্ছেন না পোশাকশিল্প মালিকরা। একই সঙ্গে পোশাক রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ অন্য বিষয়গুলোর দাম বৃদ্ধিতে বিক্রি ও উৎপাদন খরচের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বিশাল অসামঞ্জস্য।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম কমলেও দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে নিট ও ওভেন এক্সেসরিজ, প্যাকেজিং ও ওয়াশিং বাবদ খরচ বেড়েছে ৪.৮৮ শতাংশ। বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে ১৫ শতাংশ। গ্যাসের মূল্য বেড়েছে ১০ শতাংশ। পরিবহন ভাড়া বেড়েছে ৩০ শতাংশ। রেন্টাল বেড়েছে ২২ শতাংশ। বিজনেস প্রমোশনাল খরচ বেড়েছে ১৮ শতাংশ। ফেব্রিক, এক্সেসরিজ ও ট্যাক্স বাদ দিয়ে পোশাকের গড় উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৭.১১ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৫ সালের শেষ দিকে এসে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। যার প্রভাব পড়ে ২০১৬ সালের পুরো সময় জুড়েই। এ ছাড়া গত বছর জুলাই মাসের পর কোনোরকম ঘোষণা ছাড়াই আবার বাড়ানো হয়েছে পানির দাম। একই সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন সেবার ফি ও কমিশনের হারও বাড়ানো হয়েছে। বিজিএমইএ আরও জানায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮টি দেশে ২০১৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পোশাকের দাম কমেছে ২.৮৫ শতাংশ। একইভাবে ২০১৬ সালের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের দাম কমেছে ০.৫৩ শতাংশ। একদিকে রপ্তানির মূল্য হ্রাস, অন্যদিকে উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি এবং টাকার শক্তিশালী অবস্থানের কারণে মোট আয়ের পরিমাণ কমেছে ৬২.৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৩ সালে যেখানে এক পিস পোশাক রপ্তানি করে নিট আয় হতো ১২ টাকা, সেখানে ২০১৫ সালে নিট আয় হচ্ছে ৪ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৮ সালের পর ২০১৬ সাল ছিল বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার বছর। আট বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ঘিরে বৈশ্বিক মন্দা দীর্ঘদিন ভুগিয়েছিল বিশ্ব অর্থনীতিকে। এক দশক পর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের অর্থনৈতিক মন্দা, ব্রেক্সিটের প্রভাব, তেলের দাম কম, মুদ্রার দরপতনের প্রভাবে ভুগছে দেশের পোশাক খাত।

বিজিএমইএর সহ-সভাপতি ফেরদৌস পারভেজ বিভান বলেন, দেশে মজুরি ও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। অন্যদিকে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে একটু টানাপড়েন চলছে। ভোক্তারা পোশাকের জন্য বেশি অর্থ খরচ করতে চাইছে না। সেজন্য ব্রান্ডগুলো ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়াচ্ছে না, কিন্তু উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের চেয়ে প্রতি পোশাকে ১৫-২০ সেন্ট কম দিচ্ছে। অবশ্য ক্রয় আদেশের পরিমাণ বেশি হওয়ায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না। দৃশ্যত রপ্তানি আয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলেও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না, যা পোশাক খাতের জন্য নেতিবাচক।

বিজিএমইএর হিসাবে, গত বছরের নভেম্বর মাসে পোশাকের রপ্তানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৮৪ শতাংশ। আর এই অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৬.৩৯ শতাংশ। অথচ বিগত ১০ বছরে গড় রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ছিল ১২.২৫ শতাংশ। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমেছে ৮.৮৮ শতাংশ। আর যুক্তরাজ্যে কমেছে ২.৪৪ শতাংশ।
বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান আমাদের সময়কে জানান, বড় বাজারগুলোতে পোশাকের মূল্য কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে হ্রাস পেয়েছে তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম। মূলত এ কারণেই পোশাকের দাম কমছে।