[ ব্যবসা বানিজ্য ] 17/03/2017
 
ইন্টারনেট ব্যবহারে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ
ইন্টারনেট ব্যবহারের দিক দিয়ে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহার যে হারে বাড়ছে, বাংলাদেশে সে হারে বাড়ছে না।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারে এমন একটি চিত্র উঠে এসেছে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ফোরাম অ্যালায়েন্স ফর অ্যাফোর্ডেবল ইন্টারনেটের (এফোরএআই) ‘অ্যাফোর্ডেবিলিটি রিপোর্ট ২০১৭’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে। এ প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের ৫৮টি উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৪৬, যা আগের বছর ছিল ৩৩। এক বছরে বাংলাদেশ ১৩টি দেশের পেছনে পড়েছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে মুঠোফোনভিত্তিক ইন্টারনেট নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য মানুষ কম দামে দ্রুতগতির ইন্টারনেট পাচ্ছে না। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়নে যে ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেটিও হচ্ছে না।
এফোরএআইয়ের প্রতিবেদন ছাড়াও সম্প্রতি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে ইন্টারনেট ব্যবহারে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জনসংখ্যার হিসাবে ইন্টারনেট-বঞ্চিত একক দেশ হিসেবে পাঁচ নম্বরে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ বা ২ কোটির কিছু বেশি মানুষ প্রকৃত অর্থে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। গত বছর বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে প্রকৃত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ শতাংশের কম বলা হয়েছিল।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে ৬ কোটি ৭০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নির্ধারণে সরকারের নিয়ম হলো, ৯০ দিন বা তিন মাসের মধ্যে একজন ব্যক্তি একবার ব্যবহার করলেই তিনি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হিসেবে চিহ্নিত হবেন।

জানতে চাইলে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর প্রথম আলোকে বলেন, ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো না থাকায় সারা দেশে মুঠোফোনভিত্তিক ইন্টারনেটের ব্যবহার বেশি। কিন্তু প্রযুক্তিগত কারণে গ্রামের মানুষের জন্য তো বটেই, শহরের মানুষের জন্যও এই ইন্টারনেট ব্যয়বহুল। ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো নিশ্চিত করতে না পারলে ইন্টারনেটের দাম বর্তমানের চেয়ে আর কমানো সম্ভব নয়।

এফোরএআইয়ের প্রতিবেদনে ৫৮টি দেশের ক্রমতালিকা বা র‍্যাংকিং নির্ধারণে শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে নম্বর দেওয়া হয়েছে। দুটি বিষয়ে এ নম্বর দেওয়া হয়েছে। একটি হলো ইন্টারনেট সেবার অবকাঠামোর মান ও অপরটি কত সংখ্যক মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে প্রাথমিক ও স্থায়ী (সেকেন্ডারি)—দুই ধরনের তথ্যই ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে গবেষণার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।

ইন্টারনেট সেবার অবকাঠামো মানের জন্য বাংলাদেশ পেয়েছে ৩১ দশমিক ৮৮, আর ইন্টারনেট ব্যবহার সহজলভ্যতায় পেয়েছে ৪৫ দশমিক ৬৯। দুটোর গড়ে বাংলাদেশের স্কোর ৩৯ দশমিক ৪১; ২০১৬ সালে ছিল ৩৯ দশমিক ১৩। তালিকার এক নম্বরে থাকা কলম্বিয়ার স্কোর ৭২ দশমিক ৮৭।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ তালিকায় বাংলাদেশের আগে আছে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত ও নেপাল। তালিকায় শ্রীলঙ্কা আছে ২৪ নম্বরে। এ ছাড়া পাকিস্তান ২৮, ভারত ৩৫ ও নেপাল ৪১ নম্বরে রয়েছে। তালিকার শীর্ষ পাঁচ দেশ হলো কলম্বিয়া, মেক্সিকো, পেরু, মালয়েশিয়া ও কোস্টারিকা। আর সবচেয়ে উন্নতি করা পাঁচটি দেশ জর্ডান, বেনিন, ইকুয়েডর, বতসোয়ানা ও ভিয়েতনাম। ২০১৩ সালে ৪৬টি উন্নয়নশীল দেশের তথ্য নিয়ে র‍্যাংকিংভিত্তিক এ প্রতিবেদন প্রথম প্রকাশ করা হয়।

ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়নে সামাজিক সুরক্ষা তহবিলের (এসওএফ) অব্যবহৃত অর্থ ব্যবহার করতে না পারার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত এসওএফে জমা রয়েছে ৯১৩ কোটি টাকা। এই অর্থ কোন খাতে খরচ করা হবে সে বিষয়ে নীতিমালা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ খরচ হয়নি।

এফোরএআইয়ের প্রতিবেদনে মুঠোফোনভিত্তিক ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দামের বিষয়ে বলা হয়েছে, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৩৯টি দেশে এক গিগাবাইট (জিবি) ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনতে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মাথাপিছু মাসিক আয়ের (জিএনআই) গড়ে ২ শতাংশের বেশি খরচ হয়। বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের লোকদের মাসিক আয়ের ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ খরচ হয় এক জিবি মোবাইল ইন্টারনেট কিনতে।