[ অর্থ-বাণিজ্য ] 19/03/2017
 
গার্মেন্ট রপ্তানির প্রধান বাজার এখন জার্মানি
কয়েক দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ছিল বাংলাদেশের গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানির প্রধান বাজার। তবে সেই অবস্থা বদলে প্রথমবারের মতো গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানির প্রধান বাজার হয়েছে ইউরোপের দেশ জার্মানি। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রথম আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩৪২ কোটি মার্কিন ডলারের। একই সময়ে জার্মানিতে রপ্তানি হয়েছে ৩৫৫ কোটি ডলারের গার্মেন্ট পণ্য। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে জার্মানিতে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৩ কোটি ডলার বা ১ হাজার ৪০ কোটি টাকা।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে দেশটির বাজার স্থিতিশীল ছিল না। ফলে সেখানে ভোক্তাদের চাহিদা কমায় রপ্তানি কমে গেছে। কিন্তু একই সময়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় জার্মানির অর্থনীতি ভালো ছিল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমে গেছে প্রায় আট শতাংশ। অথচ একই সময়ে জার্মানিতে বেড়েছে সোয়া ১৮ শতাংশ।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান এটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তিনি বলেন, জার্মানির সঙ্গে আমাদের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক অনেক ভালো। ব্রেক্সিট (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া) ইউরোপের অন্যান্য দেশে প্রভাব ফেললেও জার্মানি ছিল ব্যতিক্রম। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল। এ কারণে সেখানে আমাদের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অস্থিরতার কারণে চাহিদা কমে গেছে। তবে তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির এ অস্থিরতা কেটে গেলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বড় বাজার ফের তারাই হতে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশের গার্মেন্ট রপ্তানি বাজার হিসেবে জার্মানির শীর্ষস্থানে উঠে আসার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি প্রায় আট শতাংশ কমে যাওয়া। এটি বাংলাদেশের জন্য চিন্তার বিষয়। তবে তিনি বলেন, জার্মানিতে বাংলাদেশ জিএসপি (শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা) পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাচ্ছে না। বাজার সুবিধা থাকলে একটি দেশে রপ্তানি বাড়তে পারে - সেটি জার্মানির রপ্তানির এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করল। এটি একইভাবে উন্নত দেশে স্বল্পোন্নত দেশের বাজার সুবিধার প্রয়োজনীয়তাও প্রমাণ করে। প্রসঙ্গত, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ককর পরিশোধ করতে হচ্ছে।
অবশ্য জার্মানিতে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকের একটি অংশ বাইরের দেশে যাচ্ছে বলে মনে করেন জার্মানিতে পোশাক রপ্তানিকারক এবং বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি এবিএম সামছুদ্দিন। তিনি বলেন, জার্মানি যে পরিমাণ পোশাক আমদানি করে তার সবটুকুই সেখানে বিক্রি হয় না। এর একটি বড় অংশ রাশিয়াসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে যায়। তিনি বলেন, জার্মানিতে অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের কোনো খুচরা বিক্রি প্রতিষ্ঠান (স্টোর) নেই। তারা বাংলাদেশ, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পোশাক আমদানি করে তা বিভিন্ন দেশের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু পরিসংখ্যানে এটি জার্মানিতেই রপ্তানি হিসেবে দেখায়। এ জন্য জার্মানিতে পোশাক রপ্তানি বাড়ছে।
আগামী কয়েক মাসে রপ্তানি আদেশের যে ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে চলতি অর্থবছরে জার্মানিই রপ্তানিতে শীর্ষস্থান অর্জন করত যাচ্ছে বলে ধারণা করছেন, সংশ্লিষ্টরা। গত আট মাসে সার্বিক রপ্তানির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ৩৮৪ কোটি ডলারের পোশাক। একই সময়ে জার্মানিতে রপ্তানি হয়েছে ৩৭৮ কোটি ডলারের পণ্য।
গত আট মাসে জার্মানিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় আকারের প্রবৃদ্ধি হলেও অন্যান্য বড় বাজারে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। সবমিলিয়ে আলোচ্য সময়ে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে তিন শতাংশেরও কম (২ দশমিক ৮২ শতাংশ)। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলেও চলতি অর্থবছরে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে না।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এ কারণে জার্মানিতে রপ্তানির এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি অন্যান্য বাজারে রপ্তানি বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য পণ্য রপ্তানি বাড়াতে হবে।