[ প্রথম পাতা ] 08/04/2017
 
সিইওকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেয়ার সুযোগ দিয়েছে আইডিআরএ
প্রতি বছর প্রায় হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে বীমা খাতের দেশীয় প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। আর এ ব্যবসা থেকে নিট আয়ের একটা অংশ ‘পারফরম্যান্স বোনাস’ হিসেবে পাবেন কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হেমায়েত উল্লাহ। নিয়োগকালে কোম্পানির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে এ সুবিধা পাবেন তিনি। যদিও বীমা আইন অনুযায়ী কোম্পানির সিইওকে এ ধরনের আর্থিক সুবিধা দেয়ার সুযোগ নেই। তা সত্ত্বেও তার পুনর্নিয়োগ অনুমোদন করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।  

বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়োগ ও নবায়নবিধি অনুযায়ী, কোনো বীমা কোম্পানি সিইও নিয়োগের আগে প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত, সম্মানী প্যাকেজ এবং তাকে নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন-সংক্রান্ত বোর্ডসভার কার্যবিবরণী নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে দাখিল করবে। সবকিছু যাচাই-বাছাই শেষে সিইও নিয়োগে অনুমোদন দেবে আইডিআরএ। কিন্তু আইনের এ বিধানগুলো না মেনেই অন্যান্য সদস্যের আপত্তি সত্ত্বেও হেমায়েত উল্লাহকে ফারইস্ট লাইফের সিইও হিসেবে অনুমোদন দেন আইডিআরএর সাবেক চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সিইও হেমায়েত উল্লাহর সঙ্গে তার কোম্পানির যে চুক্তি হয়েছে, সে অনুযায়ী কোম্পানির নিট আয় থেকে ‘পারফরম্যান্স বোনাস’ নিতে পারবেন তিনি। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সম্মতিক্রমে যেকোনো সময় কোম্পানি থেকে অব্যাহতি নিতে পারবেন হেমায়েত উল্লাহ। কিন্তু এ চুক্তির দুটি শর্তই মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা-২০১২ এর লঙ্ঘন। বিষয়টি নিয়ে আইডিআরএর এক সদস্য আপত্তি জানালেও তা আমলে নেননি সংস্থাটির তত্কালীন চেয়ারম্যান।

বীমা আইন অনুযায়ী, বীমা কোম্পানির সিইও কোম্পানির আর্থিক মানদণ্ড অনুসারে বেতন-ভাতা, অন্য সুবিধাদি ছাড়া অন্য কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সুবিধা (যেমন লভ্যাংশ, কমিশন,  যেকোনো ধরনের ক্লাব সদস্য-সংক্রান্ত আর্থিক সুবিধা) পাবেন না। এখানে অন্যান্য সুবিধা বলতে গাড়ি, জ্বালানি, চালক, ইউটিলিটি বিল, ছুটি, পরিবহন সহায়তার কথা বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ মাইনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ফারইস্ট লাইফ চেয়ারম্যানের সঙ্গে সিইওর চুক্তিতে যদি কোম্পানির নিট আয় থেকে পারফরম্যান্স বোনাস নেয়ার সুযোগ রাখা হয়, তাহলে তা বীমা আইনের ব্যত্যয়।

প্রিমিয়াম বাবদ বীমাগ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় এবং এখান থেকে কোনো ধরনের বোনাস দেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রেখে বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য একটি ‘অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন গাইডলাইন’ প্রণয়ন করেছে আইডিআরএ। কিন্তু ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান ও সিইওর মধ্যকার চুক্তি অনুমোদন দিয়ে নিজেদের তৈরি নীতিমালা নিজেই ভঙ্গ করেছেন আইডিআরএর সাবেক চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ।

এ বিষয়ে ওই সময় দায়িত্বে থাকা আইডিআরএর সাবেক সদস্য কুদ্দুস খান বলেন, শুধু বলতে চাই চেয়ারম্যানের একক সিদ্ধান্তেই এ অনুমোদন দেয়া হয়। ওই সময় অন্য সদস্যদের পক্ষ থেকে একাধিকবার আপত্তি জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখানে কারোরই কিছু করার ছিল না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন অনুযায়ী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের নিট ব্যবসায়িক আয়ের ৯০ শতাশের মালিক বীমাগ্রহীতা। তাই বীমাগ্রহীতাদের প্রিমিয়ামের অর্থ থেকে সিইওকে পারফরম্যান্স বোনাস দেয়ার কোনো অধিকার কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের নেই। এ প্রক্রিয়ায় কোম্পানির অর্থ পাচারের সুযোগ থাকে বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমান বলেন, এটা অনেক বড় একটা ঘটনা। বিষয়টি আমরাও যাচাই করে দেখব যে, এখানে অর্থ পাচারের মতো কোনো ঘটনা ঘটছে কিনা। এক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কারোর বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ প্রমাণ হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।

ফারইস্ট লাইফ সিইওর চাকরির মেয়াদ ও নবায়ন অনুমোদনের আবেদনের সঙ্গে দাখিলকৃত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, তার মোট বেতন ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে মাসিক বেতন ৪ লাখ, বাড়িভাড়া ২ লাখ ৪০ হাজার, চিকিত্সা ভাতা ১৫ হাজার, বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা ৫০ হাজার, মহার্ঘ ভাতা ৪০ হাজার, ইউটিলিটি বিল ৪৫ হাজার ও আপ্যায়ন ভাতা ১০ হাজার টাকা। এছাড়া সার্বক্ষণিক ড্রাইভার, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণসহ একটি গাড়ি, একটি মোবাইল ফোন ও তার বিল, ল্যান্ড ফোন যার সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিল কোম্পানি বহন করবে। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী উত্সব ভাতা এবং পারফরম্যান্স বোনাসও পাবেন হেমায়েত উল্লাহ।

এ বিষয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, আইডিআরএর অনুমোদন নিয়েই সিইও নিয়োগ হয়েছে। আইন লঙ্ঘন করে আমরা কিছু করিনি। একই বক্তব্য দেন ফারইস্ট লাইফের সিইও হেমায়েত উল্লাহ।

তবে ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রতিষ্ঠাতা এমএ খালেক বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে বীমা খাতের সঙ্গে জড়িত। তাই এতটুকু জানি, আইন অনুযায়ী জীবন বীমা কোম্পানির সিইও বেতন-ভাতা ছাড়া কোম্পানির ব্যবসা থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা পাবেন না।  প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা হলেও পরিচালনা পর্ষদে আমি নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে আমি বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করব।

উল্লেখ্য, শীর্ষস্থানীয় এ ইসলামী জীবন বীমা কোম্পানির সিইও অবৈধভাবে কোনো সম্পদ অর্জন করেছেন কিনা, তা অনুসন্ধানে গত জানুয়ারিতে সরকারের ১২টি দপ্তরে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক কর্মকর্তারা জানান, হেমায়েত উল্লাহ ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সিইও পদে নিয়োগ পান ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সিইও পদে মোটা অংকের বেতন-ভাতা পান তিনি। কিন্তু এ আয়ের ওপর ভিত্তি করেই এত সম্পদ অর্জন সম্ভব কিনা, সে বিষয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

বীমা খাতের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন ইন্স্যুরেন্স ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও বিএম ইউসুফ আলী এ বিষয়ে বলেন, খুবই অবাক হচ্ছি আইডিআরএ এই ধরনের অনুমোদন দেয় কীভাবে। বীমা খাতের এমডিদের কোম্পানি থেকে অন্য কোনো ধরনের কমিশন বা লভ্যাংশ নেয়ার সুযোগ নেই।