[ প্রথম পাতা ] 18/04/2017
 
ফেসবুকের ফেক আইডির সঙ্গে বন্ধ হচ্ছে অনেক প্রকৃত আইডি
ফিরোজ মান্না ॥ বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে রাজধানীর মোট জনসংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখ। কিন্তু ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে রাজধানী ঢাকায় সামাজিক এই যোগাযোগ মাধ্যমে আইডির সংখ্যা দুই কোটি। অর্থাৎ বসতির থেকে ২০ লাখ আইডি বেশি। এই হিসাবে কমপক্ষে ২০ লাখ ভুয়া ও একাধিক আইডি থাকার কথা বলছেন আইটি বিশেষজ্ঞরা। যার সূত্র ধরেই ভুয়া এ্যাকাউন্ট বন্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে ফেবু কর্তৃপক্ষ। তবে বাংলাদেশে ভুয়া লাইক ও কমেন্ট সবচেয়ে বেশি আসে ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরব থেকে। বিটিআরসি হিসাবে দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দুই কোটি ৩৩ লাখ। এদিকে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের ভুয়া আইডি বন্ধের অভিযানে অনেকের প্রকৃত আইডি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিটিআরসি জানিয়েছে, যাদের প্রকৃত আইডি বন্ধ হয়েছে তারা সরাসরি ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধান করতে পারবে। এছাড়াও বিটিআরসির কাছে অভিযোগ জানায়, তাহলে বিটিআরসি প্রকৃত আইডি খুলে দেয়ার জন্য ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাবে।

ভুয়া ফেসবুক এ্যাকাউন্ট বন্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন দেশের আইটি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এতে সাইবার অপরাধ কমবে। কমবে সামাজিক অস্থিরতাও। পাশাপাশি উগ্র মৌলবাদীদের অপপ্রচার ও নারীদের উত্ত্যক্ত অনেকাংশে বন্ধ হবে। সেই সঙ্গে যারা ফেসবুক ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেবে তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। তাদের পরামর্শ, যদি সম্ভব হয় সকল আইডির বিপরীতে মোবাইল নম্বর বা জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর নিশ্চিত করা হোক।

বাংলাদেশে গত তিন দিনে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে অনেক ভুয়া আইডি (এ্যাকাউন্ট) বা পেজ বন্ধ করে দিয়েছে। ভুয়া আইডির সঙ্গে অনেক প্রকৃত আইডি বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিটিআরসির (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. শাহজাহান মাহমুদ জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা প্রকৃত আইডি উদ্ধারে সহযোগিতা দেব। প্রকৃত আইডির ব্যক্তিরাও নিজেরা ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইডি উদ্ধার করতে পারবেন। ভুয়া বা ফেক আইডি বন্ধের বিষয়ে আমরা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে আগেই অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তবে ফেক আইডির সঙ্গে কিছু প্রকৃত আইডিও বন্ধ হচ্ছে। এ বিষয়ে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাতে প্রকৃত আইডি বন্ধ না হয় সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। ফেসবুকের প্রকৃত ব্যবহারকারীদের এ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেলে তা খোলার জন্য বিটিআরসি উদ্যোগ নেবে।

গত শনিবার ফেসবুক কর্তৃপক্ষের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভুয়া এ্যাকাউন্ট ঠেকানোর কার্যকর উপায় হিসেবে উন্নত ব্যবস্থা হিসেবে ‘স্প্যাম অপারেশন’ কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরবসহ অন্য কয়েকটি দেশ থেকে আসা ভুয়া লাইক ও মন্তব্য ঠেকাতে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। ফেসবুক দাবি করেছে, তারা অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত বিশাল একটি গ্রুপকে শনাক্ত করতে পেরেছে। তাদের মাধ্যমে প্রচারিত ভুয়া লাইক সরিয়ে ফেলেছে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের এই অভিযানে ভুয়া এ্যাকাউন্ট সরানোয় যেসব পেজে ১০ হাজারের বেশি লাইক আছে, তাতে ৩ শতাংশ লাইক কমে যাবে।

বিটিআরসি জানিয়েছে, ফেসবুকের অভিযানের পর ভুয়া আইডির সংখ্যা কমে যাওয়ায় ফেসবুক পেজে লাইকের সংখ্যাও কমে গেছে। ফেসবুক শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে তারা ভুয়া এ্যাকাউন্ট পরিচালনার একটি আন্তর্জাতিক চক্রের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করেছে, যারা বাংলাদেশকেও তাদের প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করত। লাইক কেনা-বেচা বা অটোলাইক বাণিজ্য করে এমন বহু মানুষ বাংলাদেশে রয়েছে, যাদের বিজ্ঞাপনী কমেন্ট বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টেই পাওয়া যায়। ফেসবুকে অনেক ই-কমার্স পাতা কিংবা সেলেব্রিটিরা তাদের লাইকের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এদের সাহায্য নেয় বলে খবর মিলেছে।

এদিকে রবিবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে সাড়া দিয়েই ভুয়া পেজ ও আইডি বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। তবে তিনি বলতে পারেননি গত দুই দিনে কি পরিমাণ ভুয়া বা ফেক আইডি বন্ধ করেছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। তবে এ হিসাব একেবারে কম নয়। তার কোন হিসাব সরকারের কাছে নেই। গত ১০ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে ভুয়া এ্যাকাউন্ট বন্ধে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারের একটি সমঝোতা হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তারানা হালিম। এর আগে তিনি গত ৩০ মার্চ সিঙ্গাপুরে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি হাবিবুল্লাহ এন করিম জনকণ্ঠকে বলেন, ফেসবুকের এ উদ্যোগ খুবই প্রশংসনীয়। দেরিতে হলেও ফেসবুক স্বীকার করেছে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় মানুষের পরিচিতি নিশ্চিত না করে কোন কাজ করতে দেয়া উচিত হবে না। কারণ এই জগতকে মৌলবাদী শক্তি উগ্র জঙ্গী গোষ্ঠী নানাভাবে ব্যবহার করে সমাজে নানা বিশৃঙ্খা তৈরি করছে। সমাজে নানা ঘটনা ঘটেছে ফেসবুককে ব্যবহার করে। তিন কারণে ফেসবুক আইডি বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় হতে পারে। এগুলো হলো ফেসবুকের ওয়েবসাইট রক্ষণাবেক্ষণ, ভুলভাবে এ্যাকাউন্ট চালানো ও এ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা। এই তিনটি বিষয় ঠিক থাকলে কোন আইডি বন্ধ হওয়ার সম্ভবনা নেই। বন্ধ হয়ে যাওয়া আইডি উদ্ধারের জন্য ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের আগে আইডি বন্ধের কারণ জানতে হবে। আইডি উদ্ধারের বিষয়টি সঠিকভাবে ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে জানালে ওই আইডি উদ্ধার হবে।

এদিকে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অটোলাইক শেখানো হয় বা নিজের পোস্টে ইচ্ছা মতো লাইক নিয়ে দেয়া হয়। বিবিসির ফেসবুক পাতার একটি খবরে এমন কমেন্ট করেছেন এক ব্যক্তি। তিনি নিজেকে ‘লাইকের রাজা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এবং ফোন নম্বরটিও দিয়ে দিয়েছেন। যাতে তার সঙ্গে ‘অটোলাইক’ শিখবার জন্য যোগাযোগ করা যায়। তিনি এটাকে বিজ্ঞাপন হিসাবে বিবিসিকে জানিয়েছেন। আরেকজন লিখেছেন, ১৮ ঘণ্টা ‘এক্টিব’ থাকি আর সব সময় লাইক কমেন্ট করার চেষ্টা করি। চাইলে ‘এড’ করতে পারেন। বিবিসি বাংলার ফেসবুক পাতার এক একটি পোস্টে এক সময় এই ‘লাইকের রাজা’ বা ১৮ ঘণ্টা ‘এক্টিব’-এর মতো বহু কমেন্ট দেখা যেত, কিন্তু গত দুই দিনে এ ধরনের অপ্রাসঙ্গিক এবং বিজ্ঞাপনী কমেন্ট কিছু কম পাওয়া গেছে। বোঝাই যাচ্ছে, শুদ্ধি অভিযানের কিছুটা প্রভাব এখানে আছে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে ‘ভাল’ এ্যাকাউন্টও এই শুদ্ধি অভিযানের কবলে পড়ছে।

সূত্র জানিয়েছে, ফেসবুক সম্প্রতি একটি শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ফেক বা ভুয়া একাউন্ট একে একে বাতিল করছে। এক হিসাবে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফেসবুক ব্যবহারকারীর শহর। ফেক আইডির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অন্যতম অবস্থানে রয়েছে। বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ২ কোটি ৩৩ লাখের বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছেন। দেশে যত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে, এর মধ্যে ৯৯ শতাংশই ফেসবুক।

অন্যদিকে, ফেসবুক ভুয়া আইডি বন্ধ করে দেয়ার কারণ হিসাবে একটি চক্র অপপ্রচার শুরু করেছে। এই অপপ্রচারে ব্যবহার করা হচ্ছে ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের নাম। অপপ্রচারে বলা হচ্ছে, ফেসবুকে মানুষ বেশি হওয়ায় ফেসবুকের গতি কমে গেছে। এজন্য ফেসবুক থেকে কিছু ব্যবহারকারীকে বাদ দেয়া হচ্ছে। যাঁরা নিয়মিত ফেসবুকে চালান না তাদের আইডি বন্ধ করা হচ্ছে। এ বার্তা দুই সপ্তাহের মধ্যে আরও ২৫ জনকে না পাঠালে আইডি বন্ধ হয়ে যাবে। এটি একটি হোক্স বা প্রতারণামূলক বার্তা। গত কয়েক দিনে এই বার্তা ফেসবুক মেসেঞ্জারে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।