[ শেষের পাতা ] 17/04/2017
 
মিথ্যা ঘোষণার কারণ খতিয়ে দেখছে না কাস্টমস
এমদাদুল সুমন :

চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ দিকে চীন থেকে ১১ হাজার কেজি ওজনের চার্জার ব্যাটারি আমদানি করে ইকরা ট্রেড নামে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় ২৪ হাজার কেজি পণ্য আমদানির প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু অতিরিক্ত পণ্য আমদানির এ তথ্য চালানটির বিপরীতে করা ব্যাংক নথিসহ কোনো নথিতে উল্লেখ ছিল না। অতিরিক্ত ১৩ হাজার কেজি পণ্যের অর্থ কোন পথে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, তা না জেনেই নামমাত্র জরিমানা করে চালানটি ছাড় করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

শুধু ইকরা ট্রেড নয়, চলতি অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির দায়ে ১ হাজার ৪৩০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১ হাজার ২০০টি চালানে ঘোষণার চেয়ে বেশি পণ্য আমদানি কিংবা এক পণ্যের ঘোষণায় অন্য পণ্য আমদানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘোষণাবহির্ভূত পণ্যের দাম হুন্ডি কিংবা অন্য কোনো অবৈধ মাধ্যমে পরিশোধ করা হলেও তা যাচাই করে দেখেননি শুল্ক কর্মকর্তারা। ফলে অতিরিক্ত পণ্যের শুল্ক ও নামমাত্র জরিমানা দিয়েই পার পেয়ে যাচ্ছে জড়িতরা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দায়েরকৃত দুই সহস্রাধিক মামলার ক্ষেত্রেও একইভাবে ছাড় দেয়া হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ক্ষেত্রেও। এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হওয়ায় অবৈধ বাণিজ্য ও অর্থ পাচারের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গভীরতর তদন্ত না করার পেছনে লোকবল ও প্রশিক্ষণের অভাবকে দায়ী করছে শুল্ক বিভাগ।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খান বণিক বার্তাকে বলেন, এক পণ্যের ঘোষণায় ভিন্ন পণ্য আমদানি কিংবা ঘোষণার অতিরিক্ত বা কম পণ্য আমদানি হলে বাড়তি পণ্যের শুল্কসহ জরিমানা আদায় করা হয়। অতিরিক্ত পণ্যের অর্থ অবৈধ পথে পাঠানো হতে পারে। এমনকি এটি মানি লন্ডারিংও হতে পারে। তবে তা তদন্ত না করে বলা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমাদের লোকবল কম থাকায় এসব ঘটনায় তদন্ত করতে পারছি না। অর্থ পাচার বিষয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ না থাকাটাও একটি বড় কারণ। তবে বড় বড় ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা তদন্ত করে থাকি। চলতি অর্থবছরে অর্থ পাচারের সন্দেহে ১৩টির মতো মামলা হয়েছে। বাকিগুলো অর্থ পাচার মামলা না হলেও সাধারণ মামলা হয়েছে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত পণ্যের শুল্ক ছাড়াও আমদানিকারককে জরিমানা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের মামলা সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে অর্থ পাচার ও শুল্ক ফাঁকি দিতেই মিথ্যা ঘোষণায় (ওভার ইনভয়েস ও আন্ডার ইনভয়েস) পণ্য আমদানি করা হয়। অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েস (অতি মূল্যায়ন কিংবা ঘোষণার চেয়ে কম পণ্য আনা) করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে বাড়তি ঘোষিত অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। আর আন্ডার ইনভয়েসের (কম দাম প্রদর্শন কিংবা ঘোষণার অধিক পণ্য আনা) মাধ্যমে বাড়তি অর্থ হুন্ডি কিংবা অবৈধ চ্যানেলে বিদেশে বা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। এতে ফাঁকি দেয়া পণ্যের শুল্ক পরিশোধ না করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান লাভবান হয়। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই অর্থ পাচারের আশঙ্কা থাকলেও ওভার ইনভয়েসের ক্ষেত্রেই একমাত্র এ-বিষয়ক মামলা ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আন্ডার ইনভয়েসের ক্ষেত্রে সাধারণ মামলা করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব মামলা জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, চোরাচালানকারী ও অর্থ পাচারকারী চক্রটি অনেক বেশি শক্তিশালী। তারা আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমেও মিথ্যা ঘোষণায় আমদানিকৃত বাড়তি পণ্যের মূল্য হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করে। এতে সরকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি দেশের বাজারে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ দিয়ে আন্ডার ইনভয়েসের টাকা পরিশোধ করা হয়। এজন্য ব্যাংকের একটি চক্র পণ্যের মূল্য কমিয়ে-বাড়িয়ে তাদের সহায়তা করে। এ কারণে প্রতি বছরই দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হলেও তার ১ শতাংশও ধরা পড়ছে না।

তিনি বলেন, এটি থামাতে শুধু অতিরিক্ত পণ্যের শুল্ক রেখে কিংবা জরিমানা করে ছেড়ে দেয়া উচিত হবে না। কোন পথে এসব অর্থ পাঠানো হচ্ছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত তাও খতিয়ে দেখতে হবে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে এ ক্ষমতা এনবিআর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদেরও দেয়া হয়েছে।

কাস্টমস নথি সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারির শুরুর দিকে প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যের ১১ হাজার কেজি নিট ফ্যাব্রিকস (আগামপত্র নং-১৫২৫৬৮৪) আমদানি করে ঢাকার প্রতিষ্ঠান আলম করপোরেশন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক ও আমদানি নথিতে উল্লেখ করে ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের ছয় হাজার কেজি নিট ফ্যাব্রিকস। কিন্তু বাকি ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের পাঁচ টন পণ্যের মূল্য কোন পথে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, তা যাচাই করেনি শুল্ক কর্মকর্তা। ফাঁকিকৃত ২০ লাখ টাকা আদায় করেই চালানটি খালাস দেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমেই নয়, বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনা বিভিন্ন পন্থায় ঘটতে পারে। অনেক সময় পণ্যবাহী কনটেইনারের ভাড়া বেশি দেখিয়েও অর্থ পাচার করা হতে পারে। কাস্টমসের নথি থেকে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা লিমিটেডের নিয়ন্ত্রণাধীন দিনাজপুরের গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের জন্য যন্ত্রাংশ আমদানির করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া করপোরেশন। চীন থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত কনটেইনারপ্রতি ভাড়া ৮০০ ডলার হলেও ওই প্রতিষ্ঠান কনটেইনারপ্রতি ১৭ হাজার ডলার ভাড়া দেখিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে আমদানিকৃত সাতটি চালানে (আগামপত্র নং- ৫৬৬২৫১, ৫৬৬২৬৩, ৫৬৬২৯৬, ৫৬৬৩১৯, ৫৬৬২৫৭, ৫৬৬২৭৫ এবং ৫৬৬২৬৮) কনটেইনার ভাড়া বাবদ ৭৯ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২১ গুণ বেশি। এভাবে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা বিদেশে পাচারের প্রমাণ পাওয়ার পরও তা খতিয়ে দেখেনি শুল্ক কর্মকর্তারা। ভাড়া বেশি কিংবা কমের ওপর শুল্ক নির্ভর করে না যুক্তি দেখিয়ে কোনো মামলা ছাড়াই ওই সাত চালান খালাস দেয়া হয়।

একইভাবে গত ফেব্রুয়ারিতে হংকং থেকে ১৫ লাখ টাকা মূল্যের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঘোষণা দিয়ে দুই হাজার প্যাকেট আসবাব নিয়ে আসে উইনসাম ইনপেক নামের এক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, যার প্রকৃত মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। এসব পণ্যের শুল্ক আসে ৪৭ লাখ টাকা। এ ঘটনায় মামলা করা হলেও মিথ্যা ঘোষণায় আনা বাকি পণ্যের মূল্য কোন পথে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হয়নি।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বলেন, মিথ্যা ঘোষণায় আনা আন্ডার ইনভয়েসের চালানে মানি লন্ডারিং হয়ে থাকতে পারে। এটি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। মানি লন্ডারিং না হলেও কোন পথে এসব বাড়তি পণ্যের অর্থ পাঠানো হয়েছে, তা জানা দরকার। এজন্য শুল্ক গোয়েন্দা বেশকিছু প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করছে। তবে সব ধরনের আন্ডার ইনভয়েসের ক্ষেত্রে কাজ করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে জরুরি। কিন্তু এজন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকবল না থাকায় তা সম্ভব হয় না।