[ শিল্প বাণিজ্য ] 29/05/2017
 
শ্রমিক বীমার প্রিমিয়াম দেবে না মালিকপক্ষ
পোশাক শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত দেশের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। কর্মক্ষেত্রে এসব শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা কখনই নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একসময় তাও মালিকপক্ষ অনেকটা দায়সারাভাবে শ্রমিকদের জন্য বীমা করত। সম্প্রতি এ উদ্যোগেও ভাটা পড়েছে। ধীরে ধীরে শ্রমিক বীমা থেকে সরে আসতে শুরু করেছেন পোশাক শিল্প মালিকরা। শ্রমবিধির একটি ধারার সুবিধা নিয়ে এ বীমার প্রিমিয়ামও বন্ধ করে দিচ্ছেন তারা। সরকার ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে বীমার প্রিমিয়াম দেয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছেন।

দেশে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সদস্যভুক্ত সচল পোশাক কারখানা রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এর মধ্যে গোষ্ঠী বীমা রয়েছে প্রায় তিন হাজার কারখানায়। কারখানার সব শ্রমিক এ বীমার আওতায় রয়েছে বলে মালিকপক্ষ দাবি করলেও প্রিমিয়াম দেয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ ২৫ জনের। এ হিসাবে বীমা সুবিধার আওতায় রয়েছেন মাত্র ৭২ হাজার ৪০০ শ্রমিক। সংশোধিত শ্রম আইনে কোনো কারখানায় ন্যূনতম ১০০ শ্রমিক থাকলেই সেখানে গোষ্ঠী বীমার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না।

বিদ্যমান শ্রম আইন বাস্তবায়নে গত বছর শ্রমবিধি জারি করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় শ্রমিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ক্রেতা ও মালিক সমন্বয়ে শতভাগ রফতানিমুখী শিল্প খাতের জন্য কেন্দ্রীয় তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। এ তহবিলে রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কার্যাদেশের বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ জমা দিতে হবে।

বিধিমালায় এ তহবিলের সুবিধা প্রাপ্তির যোগ্যতা ও অর্থ ব্যবহার অংশের একটি ধারায় বলা হয়েছে, সুবিধাভোগী কল্যাণ হিসাব থেকে এ তহবিলে অনুদান দেয়া যাবে। এর মাধ্যমে সুবিধাভোগী বা শ্রমিকদের গোষ্ঠী বীমার বার্ষিক প্রিমিয়ামের অর্থ তহবিলে প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়েছে মালিকদের। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের জন্য স্থাস্থ্য বীমা স্কিম চালু হবে বলেও বিধিতে উল্লেখ রয়েছে।

জানা গেছে, বিধিমালার এ ধারার সুবিধা নিতে তত্পর হয়েছেন মালিকরা। ধারাটির বহুল ব্যবহারের মাধ্যমে তহবিল গঠনের লক্ষ্যে এরই মধ্যে প্রচারণা শুরু করেছে মালিক প্রতিনিধি সংগঠন বিজিএমইএ। এসব প্রচারণায় গ্রুপ বীমা প্রদান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছেন তারা।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপার এ প্রসঙ্গে বলেন, আগামী নভেম্বর থেকে বীমা দাবির অর্থ কল্যাণ তহবিল থেকে দেয়া সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি। আমরা বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে দাবিকৃত অর্থ পরিশোধের দিকে যাচ্ছি না। আমরা শ্রমিকের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ২ লাখ টাকা বীমা দাবি কল্যাণ তহবিল থেকে দিতে চাইছি। বীমা কোম্পানির মাধ্যমে গোষ্ঠী বীমা করার ক্ষেত্রে মোটা অংকের প্রিমিয়াম প্রয়োজন হবে। কল্যাণ তহবিল থেকে এ অর্থ দেয়া কঠিন।

জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ তৈরি পোশাক খাতের কল্যাণ তহবিল গঠনে ১০ সদস্যের একটি বোর্ড গঠন হয়। গত বছরের ১ জুলাই থেকে এ তহবিলে অর্থ সংগ্রহ শুরু হয়। চলতি বছরের ২০ মে পর্যন্ত তহবিলে মোট ৪০ কোটি ৯০ লাখ টাকা জমা হয়েছে।

শ্রমিক প্রতিনিধিরা বলছেন, বিধিমালার একটি ধারার মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকেই পোশাক শিল্প মালিকরা বীমার প্রিমিয়াম পরিশোধ থেকে সরে আসার চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জায়গাটি আরো সংকুচিত হয়ে আসছে। বিধিমালাটি তৈরির সময়ই এ বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল। কিন্তু মালিক ও আমলাদের আধিপত্যের কারণে আপত্তি আমলে নেয়া হয়নি। আর এ ধারা ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্প খাতে বৈষম্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শ্রমিকের বীমা করার দায়িত্ব কারখানা মালিকের। এক্ষেত্রে দাবি পরিশোধে বীমা কোম্পানির বাইরে কেন্দ্রীয় তহবিল ব্যবহার করা হলে পোশাক খাত থেকে বীমা ব্যবস্থাই উঠে যাবে। এ উদ্যোগ শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

শ্রমিক প্রতিনিধিরা জানান, রফতানিমুখী শিল্পের জন্য পৃথক তহবিলের কথা শ্রমবিধির ধারায় উল্লেখ রয়েছে। এখন রফতানিমুখী শিল্পে পোশাকসহ অনেকগুলো খাত রয়েছে। ফলে অন্যান্য খাতও পোশাক মালিকদের মতো আইনের সুবিধা নিয়ে শ্রমিকদের বঞ্চিত করার সুযোগ পাবে। এ ধারার মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রটি অনেক সংকুচিত হয়েছে। মালিকরা দায়িত্ব পালন না করার পাশাপাশি শ্রমিক শোষণের আরো বেশি সুযোগ পাচ্ছেন। মোটা দাগে মালিকরা সবসময়ই সরকারের থেকে সুবিধা আদায়ে তত্পর। এবার বীমা প্রিমিয়াম প্রদানের ক্ষেত্রেও সে প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকছে।

বিজিএমইএর সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, অক্টোবর ২০১৬ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত শ্রমিকের বীমা দাবি পরিশোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে কেন্দ্রীয় তহবিলের নির্বাহী পর্ষদের সভায়। প্রক্রিয়াটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে।