[ শিল্প বাণিজ্য ] 04/12/2017
 
১৮ হাজার কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি ৯ ব্যাংকে
ওবায়দুল্লাহ রনি :

বিশেষ ব্যবস্থায় পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণ বেড়েছে। বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন কয়েকটি ব্যাংক বছরের পর বছর ধরে মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে গত সেপ্টেম্বরে ৯ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। গত জুনে ঘাটতিতে ছিল ৭ ব্যাংক। ঘাটতির তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে ফারমার্স ও জনতা ব্যাংক। নানা অনিয়ম নিয়ে আলোচনার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মাহাবুবুল হক চিশতী সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন।

বছরের পর বছর ধরে ঘুরেফিরে সরকারি ব্যাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতি থাকছে। এসব ব্যাংকে জনগণের করের টাকায় বারবার মূলধন জোগান দেওয়ায় বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোর বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সেমিনারে এসব ব্যাংকের সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে বারবার মূলধন জোগান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে।

এদিকে কার্যক্রম শুরুর মাত্র চার বছরের মাথায় সংকটে পড়া ফারমার্স ব্যাংক সেপ্টেম্বরে এসে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়ে। চালুর পর এত কম সময়ে কোনো বেসরকারি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়ার নজির এটিই প্রথম। গত জুনে ব্যাংকটির ৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকার মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল। এ ব্যাংকের সংকট মেটাতে এক সপ্তাহের মধ্যে এর পরিচালকদের অন্তত ২শ' কোটি টাকা জোগান দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে গত সপ্তাহে ব্যাংকটির নতুন পর্ষদকে জানানো হয়েছে। বেসরকারি আইসিবি ইসলামী ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক দীর্ঘ দিন ধরে মূলধন ঘাটিতি নিয়ে চলছে। তিন মাসে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ১ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ৩১৩ কোটি টাকা থেকে কমে ২৩১ কোটি টাকা হয়েছে।

সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঘাটতির তালিকায় নতুন যুক্ত হওয়া জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে এক হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। অথচ জুনে ১৭ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত ছিল তাদের। দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে বরাবরের মতো সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। সেপ্টেম্বরে ব্যাংকটির ৭ হাজার ৫৪০ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তিন মাস আগে ঘাটতি ছিল ৩১৮ কোটি টাকা। হলমার্কসহ বিভিন্ন ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে আলোচিত সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ১৪০ কোটি টাকায় ঠেকেছে। বেসিক ব্যাংকে গত দুই বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান দিয়েছে সরকার। এরপরও সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত জুনে ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২১০ কোটি টাকা। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ৭১০ কোটি টাকা থেকে সামান্য বেড়ে ৭৪৩ কোটি টাকা হয়েছে। রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি ৭৪১ কোটি টাকা থেকে কমে ৬৯০ কোটি টাকা হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডার বা মালিকদের জোগান দেওয়া অর্থই মূলধন হিসাবে বিবেচিত। আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি সেই পরিমাণ মূলধন রাখতে হচ্ছে। কোনো ব্যাংক এ পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে মূলধন ঘাটতি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। অনেক ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মূলধন রাখায় সামগ্রিক খাতে মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে। সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোর ৮৭ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা মূলধন রাখার প্রয়োজন ছিল। ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করেছে ৯০ হাজার ১০১ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের যা ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। তিন মাস আগে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ মূলধন ছিল।