[ অর্থ-বাণিজ্য ] 07/04/2018
 
মাসের ব্যবধানে রডের দাম বেড়েছে ১৮ হাজার টাকা
দেশে এক মাসের ব্যবধানে এমএস রডের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকা। এক মাস আগে যে রড ৫২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে তা এখন কিনতে হচ্ছে ৭০ হাজার টাকা দরে। তবে ১ এপ্রিল বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও ৪ এপ্রিল শিল্প সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করে রডের দাম প্রতি টনে তিন হাজার টাকা কমিয়েছেন। লোকসান হওয়ার পরেও মন্ত্রী-সচিবের সম্মানে দাম কমানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ স্টিল মিল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মনোয়ার হোসেন।

অবশ্য বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ রডের দাম প্রতি টনে আরো কিছুটা কমানোর ঘোষণা দিতে চাপাচাপি করলেও স্টিল মিল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি বারবার বলেছেন, সংগঠনের সব নেতাকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠক না করে আর দাম কমানো সম্ভব নয়। হঠাৎ এভাবে রডের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নির্মাণ ব্যবসায়ীরা।

রডের দাম কমানো প্রসঙ্গে শিল্প সচিবের ভাষ্য, মেগা প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়নের ওপর সরকারের উন্নয়ন অভিযাত্রা জোরদারের বিষয়টি নির্ভর করছে। এমএস রড, এমএস অ্যাঙ্গেল ও সিমেন্ট হলো অবকাঠামো নির্মাণের মৌলিক কাঁচামাল। এসব পণ্যের দাম জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সব ধরনের প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। বন্দর থেকে সরাসরি কাঁচামাল আমদানির বিষয়ে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ শিল্পের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেব আমরা।

স্টিল মিল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি বলছেন, নির্মাণ কাজের ভরা মৌসুমে সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে রডের দাম বেড়ে গেছে রাতারাতি। তবে এর সঙ্গে একমত নন উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা। রড প্রস্তুত করতে তিন ধরনের রাসায়নিক আমদানি করতে হয়। সেই রাসায়নিক আমদানিতে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ২৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে রডের কাঁচামাল বিলেট ও স্ক্র্যাপ জাহাজের দাম বেড়েছে। প্রতি টন স্ক্র্যাপের দাম বেড়েছে ১৩ হাজার টাকা। বেড়েছে পরিবহন খরচ। আগে যে ভাড়ায় ২০ টন রড আনা যেত, এখন সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কড়াকড়িতে সেই ভাড়ায় সর্বোচ্চ ১৩ টন রড পরিবহন করা যাচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ বাড়ছে। এদিকে নতুনভাবে জটিলতা তৈরি হয়েছে বন্দরে। সেখানে পণ্য খালাসে লাইটার জাহাজ ভাড়া বাবদ নতুন করে খরচ বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে ডলারের বিনিময় হার। ডলারের বিনিময় হার ৭৯ টাকা থেকে গিয়ে ঠেকেছে ৮৪ টাকায়। এতেও বেড়েছে আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম। একইসঙ্গে বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। এ কারণে এর প্রভাবও পড়েছে প্রস্তুতকৃত পণ্যে। তাই দাম বেড়েছে রডের। ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি টন রডের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৮ হাজার টাকা। যদিও তা মানতে নারাজ আবাসন ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকরা। তারা বলছেন- যে হারে কাঁচামালের দাম বেড়েছে, রডের দাম বাড়ছে তার চেয়ে দ্বিগুণ হারে। যদিও গত একসপ্তাহে রড উৎপাদনকারী শিল্প মালিকদের সমিতির নেতারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে দুই দফায় প্রতি টন রডের দাম তিন হাজার টাকা কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, বর্তমানে ৬৭ হাজার টাকা টন দরে রড বিক্রি হচ্ছে। আগে যা বিক্রি হতো ৭০ হাজার টাকা দরে। সারা দেশে বছরে রডের চাহিদা রয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টন। দেশে থাকা ১৫০টি রি-রোলিং মিল এবং ২৫টি অটো স্টিল মিলের ৪০ ও ৬০ গ্রেডের ৯০ লাখ টন রড উৎপাদন করার সক্ষমতা রয়েছে।

রড প্রস্ততকারক ব্যবসায়ীদের তিনটি সংগঠনের দাবি, সিন্ডিকেটের কারণে রডের দাম বাড়েনি। গত বৃহস্পতিবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং এন্ড স্টিল মিলস এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস এসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ স্টিল মিল ওনার্স এসোসিয়েশন।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা রডের দাম বৃদ্ধির কিছু কারণ তুলে ধরেন। বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং এন্ড স্টিল মিলস এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ জানান, রডের কাঁচামাল আমদানিতে স্ক্র্যাপের দাম প্রতি টনে বেড়েছে ৩১২ ডলার থেকে ৪২৭ ডলার। কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে ডলারের মূল্য করা হয়েছে ৮০ টাকা থেকে ৮৪ টাকা। প্রতি ডলারে ৪ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতি টনে আমদানি খরচ বেড়েছে ১ হাজার ৭০৮ টাকা। এ ছাড়া কাঁচামালের মধ্যে কেমিকেল আছে যা প্রতি টনে স্পঞ্জ আয়রণ ১ হজার ৫১৯ টাকা ও ফেরো অ্যালয়েজ ৪৭০ টাকা বেড়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ভ্যাসেল থেকে সরাসরি ডেলিভারি না দিয়ে অফডেকে পণ্য স্থানান্তরের কারণে চার্জ বেড়েছে ৩২০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮ টাকা। এক্ষেত্রে প্রতি টনে ব্যয় বেড়েছে ৬৮৮ টাকা। প্রয়োজনীয় ট্রেইলার না থাকায় কন্টেইনার ফেরতে দেরির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ৩০০ টাকা। এ ছাড়া সরকার এক্সেল লোড আইন প্রবর্তনের কারণে প্রতি টনে খরচ বেড়েছে ৪৮০ টাকা। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ট্রেইলারের ভাড়া ২৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো আর ব্যাংক সুদের হারও রডের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে জানান অটো রি-রোলিং এন্ড স্টিল মিলস এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক।

রড প্রস্তুতকারক এসোসিয়েশনের সভাপতি জানান, বছরে বাংলাদেশে ৯০ লাখ টন রডের উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও চাহিদা রয়েছে মাত্র ৫৫ লাখ টনের। তাই প্রতিযোগিতা করে এই ব্যবসা চালাতে হয়। বর্তমানে প্রতি টন রডের দাম ৭০ হাজার টাকা হলেও বাণিজ্যমন্ত্রীর সম্মানে ২ হাজার টাকা কমিয়ে প্রতি টন রড ৬৮ হাজার টাকা দরে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর বেশি কমাতে হলে এসোসিয়েশনের সব নেতাদের নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অবশ্য পরে শিল্প সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে আরো এক হাজার টাকা কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আবাসন নির্মাতা ব্যবসায়ী শামীম তারেক মনে করেন, রডের দাম যে হারে বেড়েছে তা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। হঠাৎ রডের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে অভিযোগ তার।

এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়া রড ও সিমেন্টের দাম কমানো একমাত্র তার মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বয় সভা করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আগামী ১০ থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে এই সভা করতে হবে বলেও জানান তিনি।