[ শেষের পাতা ] 26/04/2018
 
পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে চেষ্টা
পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ানোর জটিলতা নিরসনের উপায় খুঁজছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এর অংশ হিসেবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগসীমার আওতামুক্ত রাখার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সাথে বাজার মূল্যের পরিবর্তে শেয়ারের বিনিয়োগ মূল্যকে বিনিয়োগসীমার হিসাবায়নে রাখার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এসইসি যৌথ বৈঠকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠেয় এ সংক্রান্ত সমন্বয় কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির। বৈঠকে এসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। এ জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে আলাদা কোম্পানি হিসেবে গঠনের নির্দেশ দেয়। সাবসিডিয়ারি কোম্পানি গঠন করার আগে ব্যাংকগুলো তাদের মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে ইচ্ছামাফিক বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু যখনই মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজকে আলাদা কোম্পানি হিসেবে গঠন করা হয়, তখন প্রতিটি কোম্পানি একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একক ঋণগ্রহীতার শর্তের আওতায় চলে আসে; অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ মূলধনের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এর আগে ব্যাংকগুলো এক একটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল পুঁজিবাজারে। ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো আলাদা কোম্পানি গঠন হওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ এসব কোম্পানির ওপর বর্তায়। ২০১০ সালের শুরু থেকে পুঁজিবাজারের ভয়াবহ দরপতন হতে থাকে। এর প্রভাব পড়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ওপর।
২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা হয়, যা ওই বছরের ২০ জুলাই এ-সংক্রান্ত এক গেজেট প্রকাশিত হয়। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ গেজেট জারির দিন থেকে তিন বছরের মধ্যে মোট মূলধনের ২৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে বলা হয়। এর ফলে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের নতুন বিনিয়োগে হাত-পা বেঁধে দেয়া হয়।
জানা গেছে, আগে ব্যাংকগুলো তার মোট দায়ের ১০ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বা শেয়ার ধারণ করতে পারত। মোট দায় বলতে ব্যাংকগুলোর মূলধন বাদে সব সম্পদের মূল্যের যোগফল বোঝাত। ওই সময় ব্যাংকগুলোতে পাঁচ লাখ কোটি টাকার মোট সম্পদ ছিল। কিন্তু সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনানুযায়ী ব্যাংকগুলো পরিশোধিত মূলধন, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি, রিটেইন আর্নিং ও শেয়ার প্রিমিয়াম অ্যাকাউন্টের সমন্বয়ে যে অর্থ থাকবে তার ২৫ শতাংশের বেশি অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে না। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তখন মোট সমন্বিত ৭০ হাজার কোটি টাকার মূলধনের ২৫ শতাংশ হিসেবে ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকার। সূত্র জানিয়েছে, তখন বেশির ভাগেরই বাড়তি বিনিয়োগ ছিল। এ বাড়তি বিনিয়োগ ধাপে ধাপে অর্থাৎ ২০১৬ সালের ২১ জুলাইয়ের মধ্যে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেয়া হয়। এর পর থেকে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলো আর নতুন বিনিয়োগ করতে পারেনি। অনেকেই লোকসান সমন্বয় করার সুযোগ না পাওয়ায় এক দিকে পুঁজিবাজারে টাকার প্রবাহ কমে যায়, অন্য দিকে প্রতি বছরই পুঁজিবাজারের বিনিয়োগজনিত লোকসান সমন্বয় করা হয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা থেকে।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালান্সশিট রিপোর্টিংয়ে মার্ক টু মার্কেট ভিত্তিতে করা হয়। অর্থাৎ কোনো মার্চেন্ট ব্যাংক একটি কোম্পানি শেয়ার ১০০ টাকায় কিনল। দাম কমে তা ৯০ টাকা হলো। নীতিমালা অনুযায়ী ৯০ টাকা আসল এবং ১০ টাকা লোকসান হিসেবে দেখাতে হয়। আর এ লোকাসান সমন্বয় করতে হয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে। আবার কোনো কোম্পানির শেয়ার ১০০ টাকায় কিনল। তখন বিনিয়োগসীমা অর্থাৎ ২৫ শতাংশের মধ্যেই ছিল। ওই কোম্পানির শেয়ার পরদিন দাম বেড়ে ১২০ টাকা হলো। তখন বিনিয়োগসীমার ওপরে উঠে গেল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালন করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ওই কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে নির্ধারিত সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে হচ্ছে।